ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাইক্রোপ্লাস্টিক: এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৫:৪৯:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / ২০ বার পড়া হয়েছে

টুথপেস্ট থেকে শুরু করে রান্নার তেল — সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় দৈনন্দিন ব্যবহার্য দুটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিওর কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’ পরীক্ষাগারে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটিআইআর) স্পেকট্রোস্কোপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপও চালানো হয়।

ফলাফলে দেখা যায়:

  • পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে — অর্থাৎ প্রতি চারটির মধ্যে প্রায় তিনটিতেই।
  • প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
  • সর্বোচ্চ মাত্রা মিলেছে একটি জেল-টাইপ টুথপেস্টে (৩২০টি কণা/১০০ গ্রাম), এরপর একাধিক পরিচিত ব্র্যান্ডে ৮০ থেকে ১৬০টি পর্যন্ত কণা পাওয়া গেছে।
  • শিশুদের জন্য তৈরি ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে — যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুরা পরিবেশ দূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
  • বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনোভাবেই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়, কারণ এটি সরাসরি মুখগহ্বরের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। ফলাফল প্রকাশের পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পুনঃপরীক্ষা শুরু করেছে এবং প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিটও দায়ের হয়েছে।

সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক

আরেকটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের নমুনায়ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে প্রায় ৫৩ হাজারের বেশি প্লাস্টিক কণা মিলেছে। এতে দেখা যায়, বোতলজাত তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি — যার মূল কারণ হিসেবে প্লাস্টিক প্যাকেজিং, বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া, পরিবহন ও সংরক্ষণ পদ্ধতিকে দায়ী করা হচ্ছে। খোলা তেলে দূষণের মাত্রা কিছুটা কম হলেও তা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়; বাতাসের মাধ্যমে পরিবেশের কণা মিশে যাওয়া বা খোলা পাত্রে সংরক্ষণের কারণে এতেও দূষণ ঘটতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য। এগুলো দুইভাবে তৈরি হয়:

  • প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: সরাসরি ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা হয়, যেমন প্রসাধনী সামগ্রীতে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড, সিন্থেটিক কাপড়ের সূক্ষ্ম তন্তু।
  • সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: বড় প্লাস্টিক বর্জ্য (বোতল, ব্যাগ, প্যাকেজিং) রোদ, তাপ, ঘর্ষণ ও যান্ত্রিক ক্ষয়ের ফলে ভেঙে ভেঙে তৈরি হয়।

পলিথিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC), পলিস্টাইরিন (PS)-এর মতো বিভিন্ন প্লাস্টিক থেকে এই কণা তৈরি হতে পারে। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র ও হালকা যে সহজেই মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

আর কোথায় কোথায় পাওয়া যেতে পারে

টুথপেস্ট ও ভোজ্যতেল ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের বহু জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে:

  • বোতলজাত ও কলের পানি — প্লাস্টিকের বোতল ও পাইপলাইন থেকে কণা মিশে যায়
  • লবণ ও সামুদ্রিক মাছ — সমুদ্র ও নদীর পানিতে মিশে থাকা প্লাস্টিক মাছ ও চিংড়ির শরীরে জমা হয়, পরে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে
  • চা-পাতার ব্যাগ (টি ব্যাগ) — অনেক টি ব্যাগে ব্যবহৃত সিন্থেটিক জাল গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছাড়ে
  • প্লাস্টিকের পাত্রে রান্না বা গরম খাবার সংরক্ষণ, বিশেষত মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক বাটি ব্যবহার
  • প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা সামগ্রী — স্ক্রাব, শ্যাম্পু, লিপস্টিক, সানস্ক্রিনে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড
  • সিন্থেটিক কাপড় (পলিয়েস্টার, নাইলন) — কাপড় কাচার সময় সূক্ষ্ম ফাইবার পানিতে মিশে যায়
  • বাতাস ও ঘরের ধুলা — শহরাঞ্চলের বাতাসে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে
  • প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার — প্লাস্টিক মোড়কে সংরক্ষিত খাবারেও কণা মিশে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে
  • কৃষিজমির মাটি — প্লাস্টিক বর্জ্য ও সার-কীটনাশকের প্যাকেজিং থেকে মাটিতে জমা হয়ে ফসলে প্রবেশ করে

স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবে প্রাথমিক প্রমাণগুলো উদ্বেগজনক:

  • হজমতন্ত্রে প্রদাহ — অন্ত্রে জমা হয়ে প্রদাহ ও হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে
  • রক্তপ্রবাহে প্রবেশ ও অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া — গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা ও হৃদযন্ত্রেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে
  • হরমোনজনিত সমস্যা — প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা রাসায়নিক (যেমন BPA, ফথ্যালেট) শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করতে পারে, যা প্রজনন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে
  • দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি — কিছু গবেষণায় ক্যান্সার ও স্নায়বিক জটিলতার সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন
  • রোগজীবাণু বহনের বাহক — মাইক্রোপ্লাস্টিকের অমসৃণ পৃষ্ঠে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস আটকে থাকতে পারে, যা শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে
  • শিশুদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি — শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা এই দূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না যে কোন মাত্রার এক্সপোজার কতটা ক্ষতিকর — বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাধান কী

ব্যক্তি পর্যায়ে করণীয়

  • প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার বা তরল না রাখা; কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা
  • মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক পাত্র ব্যবহার এড়িয়ে চলা
  • সিন্থেটিক ফাইবারযুক্ত টি ব্যাগের বদলে খোলা চা-পাতা ব্যবহার করা
  • একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) প্লাস্টিক যথাসম্ভব পরিহার করা — প্লাস্টিক ব্যাগ, স্ট্র, বোতল ইত্যাদির বিকল্প খোঁজা
  • মাইক্রোবিডযুক্ত প্রসাধনী সামগ্রী এড়িয়ে যাচাই করে পণ্য কেনা
  • সম্ভব হলে বোতলজাতের বদলে কাচের পাত্রে ভোজ্যতেল কেনা বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করা
  • সিন্থেটিক কাপড় কম কেনা এবং কাপড় কাচার সময় মাইক্রোফাইবার ফিল্টার ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা

নিয়ন্ত্রক ও সরকারি পর্যায়ে করণীয়

  • খাদ্য ও প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নিয়মিত মান পরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করা (বিএসটিআই-এর মতো সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা)
  • টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোবিড ও প্লাস্টিক পলিমার ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিষেধাজ্ঞা প্রণয়ন করা (যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশে ইতিমধ্যে করা হয়েছে)
  • ভোজ্যতেল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
  • একক-ব্যবহার প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা চালানো এবং গবেষণার ফলাফল সহজবোধ্য ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া

গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজন

মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ে আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রয়োজন — বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা মান ও তদারকি ব্যবস্থা এখনো অপেক্ষাকৃত দুর্বল। পাশাপাশি বিকল্প, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


তথ্যসূত্র: ইএসডিও গবেষণা প্রতিবেদন, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪, যুগান্তর, মানবজমিন (Mzamin), মেডিভয়েস বিডি, অর্থসূচক ও অন্যান্য গণমাধ্যম প্রতিবেদন অবলম্বনে (জুলাই ২০২৬)।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মাইক্রোপ্লাস্টিক: এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

আপডেট সময় ০৫:৪৯:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

টুথপেস্ট থেকে শুরু করে রান্নার তেল — সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় দৈনন্দিন ব্যবহার্য দুটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিওর কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’ পরীক্ষাগারে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটিআইআর) স্পেকট্রোস্কোপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপও চালানো হয়।

ফলাফলে দেখা যায়:

  • পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে — অর্থাৎ প্রতি চারটির মধ্যে প্রায় তিনটিতেই।
  • প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
  • সর্বোচ্চ মাত্রা মিলেছে একটি জেল-টাইপ টুথপেস্টে (৩২০টি কণা/১০০ গ্রাম), এরপর একাধিক পরিচিত ব্র্যান্ডে ৮০ থেকে ১৬০টি পর্যন্ত কণা পাওয়া গেছে।
  • শিশুদের জন্য তৈরি ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে — যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ শিশুরা পরিবেশ দূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
  • বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে ১টিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এবং ভিয়েতনামের ২টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনোভাবেই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়, কারণ এটি সরাসরি মুখগহ্বরের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। ফলাফল প্রকাশের পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পুনঃপরীক্ষা শুরু করেছে এবং প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিটও দায়ের হয়েছে।

সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক

আরেকটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের নমুনায়ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে প্রায় ৫৩ হাজারের বেশি প্লাস্টিক কণা মিলেছে। এতে দেখা যায়, বোতলজাত তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি — যার মূল কারণ হিসেবে প্লাস্টিক প্যাকেজিং, বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া, পরিবহন ও সংরক্ষণ পদ্ধতিকে দায়ী করা হচ্ছে। খোলা তেলে দূষণের মাত্রা কিছুটা কম হলেও তা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়; বাতাসের মাধ্যমে পরিবেশের কণা মিশে যাওয়া বা খোলা পাত্রে সংরক্ষণের কারণে এতেও দূষণ ঘটতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য। এগুলো দুইভাবে তৈরি হয়:

  • প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: সরাসরি ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা হয়, যেমন প্রসাধনী সামগ্রীতে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড, সিন্থেটিক কাপড়ের সূক্ষ্ম তন্তু।
  • সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: বড় প্লাস্টিক বর্জ্য (বোতল, ব্যাগ, প্যাকেজিং) রোদ, তাপ, ঘর্ষণ ও যান্ত্রিক ক্ষয়ের ফলে ভেঙে ভেঙে তৈরি হয়।

পলিথিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC), পলিস্টাইরিন (PS)-এর মতো বিভিন্ন প্লাস্টিক থেকে এই কণা তৈরি হতে পারে। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র ও হালকা যে সহজেই মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

আর কোথায় কোথায় পাওয়া যেতে পারে

টুথপেস্ট ও ভোজ্যতেল ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের বহু জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে:

  • বোতলজাত ও কলের পানি — প্লাস্টিকের বোতল ও পাইপলাইন থেকে কণা মিশে যায়
  • লবণ ও সামুদ্রিক মাছ — সমুদ্র ও নদীর পানিতে মিশে থাকা প্লাস্টিক মাছ ও চিংড়ির শরীরে জমা হয়, পরে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে
  • চা-পাতার ব্যাগ (টি ব্যাগ) — অনেক টি ব্যাগে ব্যবহৃত সিন্থেটিক জাল গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছাড়ে
  • প্লাস্টিকের পাত্রে রান্না বা গরম খাবার সংরক্ষণ, বিশেষত মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক বাটি ব্যবহার
  • প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা সামগ্রী — স্ক্রাব, শ্যাম্পু, লিপস্টিক, সানস্ক্রিনে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড
  • সিন্থেটিক কাপড় (পলিয়েস্টার, নাইলন) — কাপড় কাচার সময় সূক্ষ্ম ফাইবার পানিতে মিশে যায়
  • বাতাস ও ঘরের ধুলা — শহরাঞ্চলের বাতাসে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে
  • প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার — প্লাস্টিক মোড়কে সংরক্ষিত খাবারেও কণা মিশে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে
  • কৃষিজমির মাটি — প্লাস্টিক বর্জ্য ও সার-কীটনাশকের প্যাকেজিং থেকে মাটিতে জমা হয়ে ফসলে প্রবেশ করে

স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবে প্রাথমিক প্রমাণগুলো উদ্বেগজনক:

  • হজমতন্ত্রে প্রদাহ — অন্ত্রে জমা হয়ে প্রদাহ ও হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে
  • রক্তপ্রবাহে প্রবেশ ও অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া — গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা ও হৃদযন্ত্রেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে
  • হরমোনজনিত সমস্যা — প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা রাসায়নিক (যেমন BPA, ফথ্যালেট) শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করতে পারে, যা প্রজনন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে
  • দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি — কিছু গবেষণায় ক্যান্সার ও স্নায়বিক জটিলতার সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন
  • রোগজীবাণু বহনের বাহক — মাইক্রোপ্লাস্টিকের অমসৃণ পৃষ্ঠে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস আটকে থাকতে পারে, যা শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে
  • শিশুদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি — শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত না হওয়ায় তারা এই দূষণের প্রতি বেশি সংবেদনশীল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না যে কোন মাত্রার এক্সপোজার কতটা ক্ষতিকর — বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমাধান কী

ব্যক্তি পর্যায়ে করণীয়

  • প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার বা তরল না রাখা; কাচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা
  • মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক পাত্র ব্যবহার এড়িয়ে চলা
  • সিন্থেটিক ফাইবারযুক্ত টি ব্যাগের বদলে খোলা চা-পাতা ব্যবহার করা
  • একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) প্লাস্টিক যথাসম্ভব পরিহার করা — প্লাস্টিক ব্যাগ, স্ট্র, বোতল ইত্যাদির বিকল্প খোঁজা
  • মাইক্রোবিডযুক্ত প্রসাধনী সামগ্রী এড়িয়ে যাচাই করে পণ্য কেনা
  • সম্ভব হলে বোতলজাতের বদলে কাচের পাত্রে ভোজ্যতেল কেনা বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করা
  • সিন্থেটিক কাপড় কম কেনা এবং কাপড় কাচার সময় মাইক্রোফাইবার ফিল্টার ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা

নিয়ন্ত্রক ও সরকারি পর্যায়ে করণীয়

  • খাদ্য ও প্রসাধনী পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নিয়মিত মান পরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করা (বিএসটিআই-এর মতো সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা)
  • টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোবিড ও প্লাস্টিক পলিমার ব্যবহারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিষেধাজ্ঞা প্রণয়ন করা (যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশে ইতিমধ্যে করা হয়েছে)
  • ভোজ্যতেল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
  • একক-ব্যবহার প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা চালানো এবং গবেষণার ফলাফল সহজবোধ্য ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া

গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রয়োজন

মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ে আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রয়োজন — বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা মান ও তদারকি ব্যবস্থা এখনো অপেক্ষাকৃত দুর্বল। পাশাপাশি বিকল্প, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


তথ্যসূত্র: ইএসডিও গবেষণা প্রতিবেদন, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪, যুগান্তর, মানবজমিন (Mzamin), মেডিভয়েস বিডি, অর্থসূচক ও অন্যান্য গণমাধ্যম প্রতিবেদন অবলম্বনে (জুলাই ২০২৬)।