ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ: একদিনে ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৩৩
- আপডেট সময় ০৫:২৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৮ বার পড়া হয়েছে
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী, যা চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছেন ঢাকা বিভাগে। ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮৮ জন। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৭০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে ৩০২ জন, বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, রংপুর বিভাগে ৮৬ জন এবং সিলেট বিভাগে সাতজন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সর্বশেষ আটজনের মৃত্যুর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরে আক্রান্ত ৫৩ হাজারের বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৫৭০ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৫৭ জনের।
এর আগের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে এক দিনে ১ হাজার ৫৬১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই দিন পর্যন্ত মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৮৩৭ এবং মোট মৃত্যু ছিল ১৪৯ জন।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে বাড়ছে চাপ
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ৮ সেপ্টেম্বর এক দিনেই নয়জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছিল, যা চলতি বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ এক দিনের মৃত্যুর ঘটনা। ওই দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৫৭১ জন।
পরবর্তী কয়েক দিনেও নতুন রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ১৩ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫৬১ জন এবং ১৪ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৭৩৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে।
ঢাকার বাইরেও বিস্তার
আগের বছরগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক বলে বিবেচিত হলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে আসছেন।
ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকা মহানগরের সমস্যা নয়; বরং দেশব্যাপী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
এডিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মশা মারার কার্যক্রম পরিচালনা করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়েও নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
জ্বর হলে অবহেলা নয়
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির উচ্চ জ্বরের পাশাপাশি মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বা বমিভাবসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, রক্তক্ষরণ, শ্বাসকষ্ট অথবা রোগীর অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সামনে আরও সতর্কতার প্রয়োজন
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিদিন হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি এবং নিয়মিত মৃত্যুর ঘটনা ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ কমাতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।








