নিখোঁজ থেকে হত্যা মামলা, আদালতে রিমান্ড ও তদন্তে উঠে আসা নানা প্রশ্ন
কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যু
- আপডেট সময় ০৪:১৫:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / ৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তদন্ত নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পরদিন তুরাগ নদে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। প্রথমে পরিবারের হত্যার সন্দেহ, এরপর ঘনিষ্ঠ পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে অসংগতি, মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা মামলা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়েছে। পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড চাইলেও ৩১ অক্টোবর বিকেলে আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বলে নাগরিক টিভি ও সময়ের আলো জানিয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪, আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি। অভিযোগ, সাক্ষীর বক্তব্য, তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা এবং প্রতিষ্ঠিত ঘটনাকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
১. কে ছিলেন তাহসিফ সাউরি?
কে এম তাহসিফ সাউরি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণের বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। পরিবার রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করে।
প্রকাশিত পরিচিতিমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফ আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। সামরিক চাকরি ছাড়ার পর তিনি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কর্মস্থলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ এবং ভার্গো টোব্যাকো ছিল।
২. ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভিডিও এবং সামরিক চাকরি ছাড়ার বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ধারণ বা প্রচারের সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে যায়।
তাঁর এক স্বজন দাবি করেছেন, তাহসিফ ভিডিওটি নিজে ধারণ করেননি; অন্য একজনের ধারণ করা ভিডিও শেয়ার করেছিলেন। তবে দ্য ডেইলি স্টার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, স্বজনের এ দাবি তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
তাহসিফের সামরিক চাকরি শেষ হওয়ার বিষয়েও বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, তাহসিফ ও আরেক কর্মকর্তাকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে অবসর দেওয়া হয়েছিল। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁদের অবসর দেওয়া হয়েছে—এমন প্রচারকে আইএসপিআর প্রত্যাখ্যান করে।
তবে অবসরের বিস্তারিত কারণ ওই বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয়নি। তাহসিফের বাবার বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারকে শৃঙ্খলাজনিত কারণের কথা জানানো হয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ২০২৪ সালের ভিডিও, সামরিক চাকরি ছাড়ার ঘটনা এবং ২০২৬ সালের মৃত্যুর মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
৩. ২৭ থেকে ৩১ অক্টোবর: পূর্ণ ঘটনাক্রম
- ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার — সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিট থেকেউত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসার গ্যারেজে তাহসিফের সঙ্গে দীপের দেখা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দুজনকে কথা বলতে এবং পরে পৃথক মোটরসাইকেলে বের হতে দেখা যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে বের হয়েছিলেন তাহসিফ।
- ২৮ অক্টোবর, বুধবার — গভীর রাত ও বিকেলপরিবারের দাবি অনুযায়ী, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে মায়ের কাছে বাড়ি ফেরার বার্তা যায়। কিন্তু তিনি ফেরেননি। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯-এ তুরাগ নদে মরদেহ ভাসার খবর পায় পুলিশ। রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
- ২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার — ময়নাতদন্ত ও দাফনশহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে উত্তরায় জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। এদিন রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই।
- ৩০ অক্টোবর, শুক্রবার — মোটরসাইকেল উদ্ধারদীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। পিবিআই দীপকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে। পরে তাঁকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
- ৩০ অক্টোবর গভীর রাত থেকে ৩১ অক্টোবর সকাল — হত্যা মামলাতাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখায় নৌ পুলিশ।
- ৩১ অক্টোবর, শনিবার — আদালতে রিমান্ডদুপুরে দীপকে ঢাকার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। বিকেলের সর্বশেষ সংবাদে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের তথ্য পাওয়া যায়।
৪. শেষ রাতের ঘটনা: দীপের বক্তব্যে কেন অসংগতি?
তদন্তে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্য।
প্রথম দিকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাঁরা উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় খাওয়াদাওয়ার পর রাত ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, দুজনে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন।
আমার দেশের ৩১ অক্টোবরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, দীপ পিবিআইকে বলেছেন, রাত ২টার দিকে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের কাছে পুলিশের পোশাক পরা দুজন তাঁদের ধাওয়া করে। তাঁর দাবি, তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পিলারের পাশে আত্মগোপন করেন। পরে একা বাড়ি ফিরে যান।
আমার দেশ পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নানের বক্তব্য প্রকাশ করেছে। তিনি জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া বর্ণনা যাচাই করা হচ্ছে এবং কথিত ধাওয়াকারীরা আসলে পুলিশ ছিলেন কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
এখানে অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে:
-
তাঁরা উত্তরার পরিবর্তে গভীর রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে কেন গিয়েছিলেন?
-
দীপের প্রথম ও পরবর্তী বক্তব্যের পার্থক্যের কারণ কী?
-
সত্যিই কেউ ধাওয়া করেছিল কি না, করলে কারা?
-
তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে থাকলে দীপ কেন সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী সংস্থা বা পরিবারকে খবর দেননি?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো চূড়ান্তভাবে পাওয়া যায়নি। দীপের বর্ণনা তদন্তাধীন সাক্ষ্য, প্রমাণিত ঘটনাক্রম নয়।
৫. মোটরসাইকেল উদ্ধার: নতুন আলামতের গুরুত্ব
নয়া দিগন্তের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরাগ নদসংলগ্ন টঙ্গীর মাজার বস্তি থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানটি মরদেহ উদ্ধারের জায়গা থেকে আনুমানিক সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে।
নয়া দিগন্ত প্রকাশের সময় মোটরসাইকেলটির মালিকানা যাচাই চলছিল বলে জানায়। অন্যদিকে বিডিনিউজ২৪ পরবর্তী প্রতিবেদনে দীপের তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটিকে তাহসিফের বলে উল্লেখ করেছে। ফলে প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে শনাক্তকরণের নিশ্চয়তার মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।
মোটরসাইকেলটি কোথায় রাখা হয়েছিল, কে রেখেছিল এবং ঘটনার রাতে সেটি কীভাবে সেখানে পৌঁছায়—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৬. আমার দেশের অনুসন্ধানে আর্থিক লেনদেন ও নতুন প্রশ্ন
আমার দেশের প্রতিবেদনে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, দীপের মোবাইল ফোনে প্রতিদিন আনুমানিক ২৫–৩০ হাজার টাকা লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই লেনদেনের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চলছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে। তবে এ তথ্যের সমর্থনে প্রকাশ্যে ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের পূর্ণ বিবরণ বা ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
কোনো ব্যক্তির আর্থিক লেনদেন থাকা নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়। একইভাবে কথিত লেনদেনের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রকাশিত সুরতহাল প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাকের কাছে রক্তের চিহ্ন এবং পেট ফোলা থাকার কথা সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুরতহালে এসব পর্যবেক্ষণ মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। ডুবে মৃত্যু, অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা যাচাইয়ে ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত প্রয়োজন।
তদন্তকারীরা প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে আমার দেশ জানিয়েছে।
তাহসিফের বাবা দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে পাইলট হিসেবে বিশেষ সাঁতার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তাই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর বর্ণনা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সাঁতার জানা ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যেতে পারেন; প্রশিক্ষণ থাকা একা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে না।
৮. সর্বশেষ আপডেট: আদালতে চার দিনের রিমান্ড
৩১ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩টা ৪৬ মিনিটের সংবাদ
দীপের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
নাগরিক টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এর আগে নৌ পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল।








