মরিয়ম খাতুনঃ দুঃখিত, আমরা কেউ আপনার সঙ্গে ইনসাফ করিনি
- আপডেট সময় ০১:৩১:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২ বার পড়া হয়েছে
মরিয়ম খাতুন, আপনাকে ঘিরে আজ কত আলোচনা, কত বিতর্ক, কত অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ! অথচ এই অসংখ্য কথার ভিড়ে সবচেয়ে জরুরি কথাটিই যেন আমরা ভুলে যাচ্ছি—আপনিও একজন মানুষ ছিলেন। আপনারও স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল, নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার ছিল। কিন্তু সেই অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা আমরা কতটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম?
আপনার অকালমৃত্যু আজ সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে একটি প্রশ্নই রেখে গেছে—এই মৃত্যুর দায় আসলে কার?
ঘটনার সূত্রপাত জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি ওই নারীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বলে দাবি করেন। এর পরপরই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর কিছুদিনের মধ্যেই রাজধানীর একটি সরকারি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ।
একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের সামনে রেখে যায় অসংখ্য প্রশ্ন, যার উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মরিয়মের বাবা নিজেও গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অর্থাৎ এই মৃত্যুর তদন্তে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতাকে আড়াল করে মরিয়মের মৃত্যুর কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতের।
তবে এই মৃত্যুকে ঘিরে আরও কিছু প্রশ্নও উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মরিয়মের পরিবার ও স্বজনদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বয়স ও ক্ষমতার দিক থেকে অসম একটি বৈবাহিক সম্পর্কে মরিয়ম কী পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেখানে তাঁর স্বাধীন সম্মতি কতটুকু ছিল এবং তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একইভাবে প্রশ্ন উঠেছে ব্যক্তিগত ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও। একজন নারীর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত কীভাবে লাখো মানুষের আলোচনা, কৌতূহল ও বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত হলো? সেই পরিস্থিতিতে তাঁকে কী ধরনের মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল? তাঁর পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আমরা কি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে আরও বেশি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম?
অনলাইন বুলিং বা গণমাধ্যমের অপ্রচার তাঁর মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিলো।এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও একটি মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিকল্পনায় গোপনে ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মরিয়মের মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। তাঁর জীবন, তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর প্রতি ন্যায়বিচারের দাবি যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা স্বার্থের ঊর্ধ্বে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন কী অবলীলায় জনসমক্ষে উন্মোচিত হলো, অথচ তাঁর সম্মতি, নিরাপত্তা কিংবা মানসিক অবস্থার কথা ভাবার প্রয়োজন আমরা কতজন অনুভব করেছি?
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, পর্দার ওপাশে যাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করছি, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল মেটাচ্ছি, যাঁকে নিজেদের নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করছি—তিনিও আমাদের মতোই একজন মানুষ। তাঁরও পরিবার আছে, অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে। আছে অপমানিত হওয়ার বেদনা এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
মরিয়মের ঘটনাটি আমাদের আরও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বয়স, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ক্ষমতার অসম সম্পর্কের মধ্যে একজন নারীর সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন থাকে? তাঁর সম্মতি, ইচ্ছা ও নিরাপত্তাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিই?
মরিয়মের প্রতি প্রকৃত ইনসাফ নিশ্চিত করতে হলে তাঁর মৃত্যুর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হতে হবে। অভিযোগের মুখে থাকা কোনো ব্যক্তিকে আগাম দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না; আবার রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা জনমতের চাপে কাউকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধী সাব্যস্ত করাও চলবে না।
ব্যক্তিগত ভিডিওটি কে ধারণ করেছিল, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়েছিল, মরিয়মের জীবনে এর কী প্রভাব পড়েছিল এবং তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল—সবকিছুই যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।কারণ মরিয়ম এখন আর নিজের হয়ে কথা বলতে পারবেন না। নিজের কষ্টের কথা বলতে পারবেন না। তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিনগুলোতে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন—সেসব কথা আমরা তাঁর মুখ থেকে আর শুনতে পাব না।
মরিয়ম খাতুন, আপনার মৃত্যু নিয়ে হয়তো আরও অনেক দিন আলোচনা হবে। কেউ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা খুঁজবেন, কেউ পারিবারিক দায়ের প্রশ্ন তুলবেন, কেউ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলবেন। সময়ের সঙ্গে হয়তো নতুন কোনো ঘটনা এসে এই আলোচনাকেও আড়াল করে দেবে। কিন্তু এত কিছুর পরও যে সত্যটি আমাদের বিবেককে তাড়া করে ফিরবে, তা হলো—আপনি আর ফিরে আসবেন না। আপনার স্বপ্নগুলো অসমাপ্ত রয়ে গেল। আপনার জীবনের গল্পটি থেমে গেল এমন এক জায়গায়, যেখানে আপনার নিজের কথাগুলো শোনার সুযোগও হয়তো আমরা যথেষ্ট করে উঠিনি।
মরিয়ম, আপনাকে নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি, কিন্তু আপনার কথা কতটুকু শুনেছি? আপনাকে নিয়ে বিচার বসিয়েছি, কিন্তু আপনার মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করেছি? আপনার মৃত্যুর পর দায় খুঁজছি, অথচ বেঁচে থাকতে আপনার নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে আমরা কতটা সোচ্চার ছিলাম? আপনার মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক এমনভাবে, যাতে কোনো প্রভাবশালী পরিচয় সত্যকে আড়াল করতে না পারে, আবার কোনো নিরপরাধ মানুষও অন্যায়ের শিকার না হন।
আর আপনার জীবনের এই মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের অন্তত এটুকু শিক্ষা দিক—কোনো নারীর ব্যক্তিগত জীবন আমাদের বিনোদনের বিষয় নয়, তাঁর সম্মতি উপেক্ষা করার বিষয় নয়, তাঁর মর্যাদা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে বিসর্জন দেওয়ার বিষয় নয়।
মরিয়ম খাতুন, আপনার কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়ার ভাষা নেই।
দুঃখিত, মরিয়ম। আমরা কেউ আপনার সঙ্গে ইনসাফ করিনি।








