ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোসাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা, আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৫:২৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

সামাজিক মাধ্যম আজ তথ্যপ্রবাহের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, কোনো সম্পাদকীয় যাচাই ছাড়াই, কোনো সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ না করেই। এই সহজলভ্যতাই একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অন্যদিকে তৈরি করেছে এক ভয়ংকর অস্ত্র—উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়া, ব্যক্তির সম্মানহানি, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়ানো, এমনকি জনস্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য—এসবই এখন সামাজিক মাধ্যমের নিত্যদিনের চিত্র। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: এই ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু এই স্বাধীনতার অর্থ কখনোই এই নয় যে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে সমাজে বিভ্রান্তি ও ক্ষতি ছড়াবে, আর তার কোনো জবাবদিহি থাকবে না। মত প্রকাশের অধিকার আর বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর “অধিকার”—এই দুটি এক জিনিস নয়। একজন ব্যক্তির নিজস্ব মতামত, সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশ করার অধিকার যেমন সুরক্ষিত হওয়া উচিত, তেমনি যাচাইকৃত মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্যের সম্মানহানি বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করাকে “মত প্রকাশ” বলে চালিয়ে দেওয়ারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশও এই পার্থক্যটি স্বীকার করে। মানহানি, উস্কানিমূলক বক্তব্য, ভুয়া খবর ছড়িয়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা—এসব ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহিতার বিধান প্রায় সব আইনি কাঠামোতেই আছে। বাংলাদেশেও এই নীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

প্রথমত, মিথ্যা প্রোপাগান্ডার সামাজিক মূল্য অনেক বড়। একটি উদ্দেশ্যমূলক গুজব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতে পারে, একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নিলে, শুধু সামাজিক নিন্দা বা প্ল্যাটফর্মের স্বেচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়।

দ্বিতীয়ত, প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা প্রায়ই ধীরগতির এবং অসম্পূর্ণ। একটি মিথ্যা তথ্য ভাইরাল হতে যে সময় লাগে, তা মুছে ফেলতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে—ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়। আইনি কাঠামো থাকলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হয়, যা ভবিষ্যতে এই প্রবণতা রোধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের পথ থাকা উচিত। যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে এই আইনি ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে একটি বিপদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। “মিথ্যা প্রোপাগান্ডা” ঠেকানোর নামে তৈরি আইন যদি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মানদণ্ডে না গড়া হয়, তাহলে তা সহজেই ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, অস্পষ্ট শব্দে লেখা “মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধ” আইন প্রায়ই সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে হয়রানি করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এমন আইনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—

  • অপরাধের সংজ্ঞা যেন স্পষ্ট ও সংকীর্ণ হয়, যাতে সমালোচনা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে “মিথ্যা প্রচারণা” বলে চালিয়ে দেওয়া না যায়;
  • বিচারিক প্রক্রিয়া যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হয়, নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছাধীন না হয়;
  • শাস্তির মাত্রা যেন অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, ভয় দেখানোর হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতা আর দায়িত্বহীনতা এক জিনিস নয়। সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন ও ক্ষতি সৃষ্টির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি। প্রশ্নটা তাই “আইন হবে কি না” নয়—প্রশ্নটা হলো, এমন একটি আইন কীভাবে তৈরি করা যায় যা সত্যিকারের ক্ষতিকর প্রচারণা ঠেকাবে, অথচ ভিন্নমত ও সমালোচনার কণ্ঠরোধ করবে না। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সোসাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা, আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত

আপডেট সময় ০৫:২৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

সামাজিক মাধ্যম আজ তথ্যপ্রবাহের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। একটি পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, কোনো সম্পাদকীয় যাচাই ছাড়াই, কোনো সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ না করেই। এই সহজলভ্যতাই একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি অন্যদিকে তৈরি করেছে এক ভয়ংকর অস্ত্র—উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারণা। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়া, ব্যক্তির সম্মানহানি, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়ানো, এমনকি জনস্বাস্থ্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য—এসবই এখন সামাজিক মাধ্যমের নিত্যদিনের চিত্র। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: এই ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু এই স্বাধীনতার অর্থ কখনোই এই নয় যে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে সমাজে বিভ্রান্তি ও ক্ষতি ছড়াবে, আর তার কোনো জবাবদিহি থাকবে না। মত প্রকাশের অধিকার আর বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর “অধিকার”—এই দুটি এক জিনিস নয়। একজন ব্যক্তির নিজস্ব মতামত, সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশ করার অধিকার যেমন সুরক্ষিত হওয়া উচিত, তেমনি যাচাইকৃত মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্যের সম্মানহানি বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করাকে “মত প্রকাশ” বলে চালিয়ে দেওয়ারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশও এই পার্থক্যটি স্বীকার করে। মানহানি, উস্কানিমূলক বক্তব্য, ভুয়া খবর ছড়িয়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা—এসব ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহিতার বিধান প্রায় সব আইনি কাঠামোতেই আছে। বাংলাদেশেও এই নীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

প্রথমত, মিথ্যা প্রোপাগান্ডার সামাজিক মূল্য অনেক বড়। একটি উদ্দেশ্যমূলক গুজব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতে পারে, একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, এমনকি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নিলে, শুধু সামাজিক নিন্দা বা প্ল্যাটফর্মের স্বেচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়।

দ্বিতীয়ত, প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা প্রায়ই ধীরগতির এবং অসম্পূর্ণ। একটি মিথ্যা তথ্য ভাইরাল হতে যে সময় লাগে, তা মুছে ফেলতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে—ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়। আইনি কাঠামো থাকলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হয়, যা ভবিষ্যতে এই প্রবণতা রোধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের পথ থাকা উচিত। যাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন।

তবে এই আইনি ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে একটি বিপদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। “মিথ্যা প্রোপাগান্ডা” ঠেকানোর নামে তৈরি আইন যদি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মানদণ্ডে না গড়া হয়, তাহলে তা সহজেই ভিন্নমত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, অস্পষ্ট শব্দে লেখা “মিথ্যা তথ্য প্রতিরোধ” আইন প্রায়ই সরকারের সমালোচক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে হয়রানি করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এমন আইনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—

  • অপরাধের সংজ্ঞা যেন স্পষ্ট ও সংকীর্ণ হয়, যাতে সমালোচনা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে “মিথ্যা প্রচারণা” বলে চালিয়ে দেওয়া না যায়;
  • বিচারিক প্রক্রিয়া যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হয়, নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছাধীন না হয়;
  • শাস্তির মাত্রা যেন অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, ভয় দেখানোর হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতা আর দায়িত্বহীনতা এক জিনিস নয়। সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন ও ক্ষতি সৃষ্টির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি। প্রশ্নটা তাই “আইন হবে কি না” নয়—প্রশ্নটা হলো, এমন একটি আইন কীভাবে তৈরি করা যায় যা সত্যিকারের ক্ষতিকর প্রচারণা ঠেকাবে, অথচ ভিন্নমত ও সমালোচনার কণ্ঠরোধ করবে না। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।