উপমহাদেশের ঐক্যের প্রবক্তা থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: জীবন ও রাজনীতি
- আপডেট সময় ১২:১৯:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩২ বার পড়া হয়েছে
ব্রিটিশ ভারতের শেষ কয়েক দশকের রাজনীতি, ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম—এই তিনটি অধ্যায় বুঝতে গেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা জিন্নাহ প্রথমদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে কাজ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির কেন্দ্রীয় মুখে পরিণত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেশটির প্রথম গভর্নর-জেনারেল হন।
জন্ম, শিক্ষা ও আইনজীবী জীবন
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্বীকৃত জন্মতারিখ ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬; জন্মস্থান করাচি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রকাশিত জীবনপঞ্জি অনুযায়ী, ১৮৮৩ সালে তিনি সিন্ধ মাদ্রাসাতুল ইসলাম-এ ভর্তি হন। ৩০ জানুয়ারি ১৮৯২ তিনি ইংল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং লন্ডনের Lincoln’s Inn-এ আইন অধ্যয়ন করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি Bar-এ অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৮৯৭ সালে বোম্বে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
বোম্বেতে অল্প সময়ের মধ্যেই জিন্নাহ আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। আদালতের যুক্তি, সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের প্রতি তার ঝোঁক পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনেও দীর্ঘ সময় দৃশ্যমান ছিল। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জীবনীতে তাকে সে সময়ের সফল বোম্বে আইনজীবীদের একজন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কংগ্রেসের রাজনীতিতে প্রবেশ
জিন্নাহ ডিসেম্বর ১৯০৪-এ বোম্বেতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম অংশ নেন। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি কংগ্রেসের প্রতিনিধি হন এবং ওই অধিবেশনেই একটি প্রস্তাবের সমর্থনে তার প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন। ৪ জানুয়ারি ১৯১০ তিনি Imperial Legislative Council-এর সদস্য নির্বাচিত হন।
তার রাজনৈতিক জীবনের এই পর্যায়ে জিন্নাহ ভারতীয় স্বশাসনের সমর্থক এবং কংগ্রেস ও মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সমঝোতার প্রবক্তা ছিলেন।
মুসলিম লীগে যোগদান এবং ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য’
জিন্নাহ ১০ অক্টোবর ১৯১৩ অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। কিন্তু তখনও তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই তিনি দুই দলের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল ১৯১৬ সালের Lucknow Pact। ৩০–৩১ ডিসেম্বর ১৯১৬ মুসলিম লীগের লখনৌ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জিন্নাহ; কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সাংবিধানিক সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। এটি ছিল কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য এক পর্যায়।
গান্ধীর রাজনীতির সঙ্গে মতবিরোধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে উঠে আসে। জিন্নাহ গণআন্দোলনের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও আইনসঙ্গত পদ্ধতিকেই অগ্রাধিকার দিতেন।
২৮ মার্চ ১৯১৯ তিনি Rowlatt Act-এর প্রতিবাদে Imperial Legislative Council থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২৫ অক্টোবর ১৯২০ Home Rule League থেকে এবং ২৮ ডিসেম্বর ১৯২০, নাগপুর কংগ্রেস অধিবেশনের সময়, গান্ধীর Non-Cooperation প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কংগ্রেস থেকে সরে যান।
এই সময় থেকে জিন্নাহর রাজনীতির কেন্দ্র ক্রমে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সরে যেতে থাকে।
ব্যক্তিজীবন
জিন্নাহ ১৯ এপ্রিল ১৯১৮ রতনবাই ‘রুত্তি’ পেটিটকে বিয়ে করেন। তাদের কন্যা দিনা জিন্নাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৪–১৫ আগস্ট ১৯১৯ লন্ডনে। রুত্তি জিন্নাহ ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ বোম্বেতে মারা যান।
নেহরু রিপোর্ট ও জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’
১৯২৮ সালের Nehru Report-এ ভারতের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামোর একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। মুসলিম নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করেছিল, এতে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিগুলো যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ মার্চ ১৯২৯ জিন্নাহ তার বিখ্যাত Fourteen Points বা চৌদ্দ দফা উপস্থাপন করেন। এতে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক সুরক্ষার মতো বিষয় ছিল।
লন্ডনে অবস্থান এবং রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন
১৯৩১ সালে জিন্নাহ লন্ডনে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং কয়েক বছর সেখানে আইনচর্চা করেন। তবে ভারতীয় মুসলিম রাজনীতির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল।
পরিস্থিতি পাল্টায় ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি। এপ্রিল ১৯৩৪ তিনি পুনরায় ঐক্যবদ্ধ মুসলিম লীগের সভাপতি হন এবং ভারতীয় রাজনীতিতে পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসেন।
১৯৩৭ সালের নির্বাচন: গুরুত্বপূর্ণ মোড়
Government of India Act 1935-এর অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন জিন্নাহর রাজনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক প্রদেশেই মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বাংলায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে আঞ্চলিক রাজনীতি, পাঞ্জাবে ইউনিয়নিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য অঞ্চলে স্থানীয় মুসলিম শক্তি ছিল প্রভাবশালী।
এরপর জিন্নাহ মুসলিম লীগকে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করার প্রচেষ্টা জোরদার করেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরের লখনৌ অধিবেশন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল; বাংলার এ কে ফজলুল হকসহ বিভিন্ন প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম নেতাদের সঙ্গে লীগের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়।
১৯৪০: লাহোর প্রস্তাব
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর একটি আসে ২২–২৪ মার্চ ১৯৪০, লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে।
২৩ মার্চ ১৯৪০ অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। মূল প্রস্তাবে উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে “independent states” গঠনের কথা বলা হয়েছিল; সেখানে ‘Pakistan’ শব্দটি ছিল না। প্রস্তাবটি ২৪ মার্চ গৃহীত হয়। পরে এটি ‘লাহোর প্রস্তাব’ বা ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত হয়।
এই ঘটনা বাংলা ও পূর্ববঙ্গের ইতিহাসের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত—কারণ প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক উত্থাপক ছিলেন বাংলার ফজলুল হক এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোও প্রস্তাবিত রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ ছিল।
গান্ধী–জিন্নাহ আলোচনা
ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতার আরেকটি বড় প্রচেষ্টা হয় ৯ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪, বোম্বেতে। গান্ধী ও জিন্নাহ একাধিক বৈঠকে ভারত স্বাধীন হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। সমসাময়িক চিঠিপত্র পরে Jinnah-Gandhi Talks, September 1944 নামে প্রকাশিত হয়।
১৯৪৪ সালের গান্ধী–জিন্নাহ ছবির British Library/Wikimedia Commons কপি
১৯৪৫–৪৬ সালের নির্বাচন ও মুসলিম লীগের শক্তিবৃদ্ধি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ভারত দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের দিকে এগোয়। ৪ ডিসেম্বর ১৯৪৫ জিন্নাহ Central Legislative Assembly-তে নির্বাচিত হন। মুসলিম আসনগুলোতে মুসলিম লীগের নির্বাচনী সাফল্য জিন্নাহকে মুসলিম রাজনীতির প্রধান আলোচক হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান দেয়। পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সময়রেখায় ১১ জানুয়ারি ১৯৪৬ লীগ কেন্দ্রীয় নির্বাচনে মুসলিম আসনগুলোর সাফল্য উদ্যাপন করে বলে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাতেও লীগের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হয়; Banglapedia-র হিসাবে, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭ আসনের মধ্যে লীগ ১১০টি পায়।
Cabinet Mission এবং শেষ ঐক্যবদ্ধ ভারতের চেষ্টা
১৯৪৬ সালে Cabinet Mission এমন একটি সাংবিধানিক পরিকল্পনা দেয় যাতে ভারতকে এক রাষ্ট্র হিসেবে রেখে প্রদেশগুলোকে বিভিন্ন গ্রুপে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
জিন্নাহর মুসলিম লীগ প্রথমে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করে; পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির chronology অনুযায়ী ৪–৬ জুন ১৯৪৬ লীগ Cabinet Mission Plan গ্রহণ করে। কিন্তু কংগ্রেসের অবস্থান এবং পরিকল্পনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধের পর লীগ সেই অবস্থান প্রত্যাহার করে এবং পৃথক পাকিস্তানের জন্য সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যায়।
১৬ আগস্ট ১৯৪৬: Direct Action Day ও কলকাতার রক্তপাত
মুসলিম লীগ ১৬ আগস্ট ১৯৪৬-কে Direct Action Day ঘোষণা করে। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান দাবির পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন। কলকাতায় হরতাল, মিছিল ও জনসমাবেশ দ্রুত ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পরিণত হয়।
হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট দায়, প্রথম সহিংসতা কারা শুরু করেছিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ফলে ঘটনাটির দায় কোনো এক পক্ষ বা একজন নেতার ওপর সরলভাবে চাপিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক বিতর্ককে যথাযথভাবে তুলে ধরে না। তবে Direct Action Day-এর ডাক মুসলিম লীগের ছিল এবং কলকাতার সহিংসতা পরবর্তী নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারত ভাগের সংকটকে আরও তীব্র করে।
১৯৪৭: ভারত ভাগের সিদ্ধান্ত
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা নির্ধারণের পথে এগোয়। নতুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করেন।
৩ জুন ১৯৪৭ ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এতে বাংলা ও পাঞ্জাবের আইনসভাকে বিভাজনের প্রশ্নে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা, সিলেটে গণভোট এবং ভারত ও পাকিস্তানের জন্য পৃথক সাংবিধানিক কাঠামোর পথ তৈরি হয়।
মুসলিম লীগের কাউন্সিল ৯–১০ জুন ১৯৪৭ পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে।
এরপর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮ জুলাই ১৯৪৭ Indian Independence Act পাস করে। আইনের মাধ্যমে India ও Pakistan নামে দুটি নতুন Dominion প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয় এবং বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়।
পাকিস্তানের জন্ম এবং জিন্নাহর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া
১১ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানের প্রথম Constituent Assembly-তে জিন্নাহ সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই ভাষণে তিনি আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও কালোবাজারি মোকাবিলা এবং নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের বিষয়ে কথা বলেন।
১৪ আগস্ট ১৯৪৭ করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম Governor-General হিসেবে শপথ নেন।
এই দুই তারিখ নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা যায়: পাকিস্তানের স্বাধীনতা উদ্যাপন ১৪ আগস্ট, আর পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নথিতে জিন্নাহর গভর্নর-জেনারেল হিসেবে শপথের তারিখ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭।
দেশভাগের মানবিক মূল্য
দেশভাগ শুধু রাজনৈতিক সীমারেখার পরিবর্তন ছিল না; এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় গণস্থানান্তরের জন্ম দেয়। ব্রিটিশ National Archives-এর হিসাবে, ১৯৪৭ সালের বিভাজনের সময় ১৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ নতুন সীমান্ত অতিক্রম করে। পাঞ্জাব ও বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, হত্যা, সম্পদহানি ও উদ্বাস্তু সংকট তৈরি হয়।
জিন্নাহ ভারত ভাগের প্রধান রাজনৈতিক আলোচকদের একজন হলেও এ বিপর্যয়ের কারণ ও দায় নিয়ে ইতিহাসচর্চায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব, দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিসহ একাধিক উপাদান আলোচিত হয়।
জিন্নাহর রাষ্ট্রভাবনা: ১১ আগস্টের ভাষণ
জিন্নাহর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় ১১ আগস্ট ১৯৪৭-এর ভাষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেখানে নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কাছে সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচনার ধারণা তুলে ধরেন এবং ধর্মবিশ্বাসকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন।
তবে তার পাকিস্তান আন্দোলনের সময়কার ‘মুসলিম জাতিসত্তা’ভিত্তিক রাজনীতি এবং স্বাধীনতার ঠিক আগে নাগরিক সমতার এই ভাষণের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—এ প্রশ্ন পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিনের আলোচ্য বিষয়।
পূর্ববঙ্গ ও ভাষার প্রশ্ন
স্বাধীনতার পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ—East Bengal, পরে East Pakistan—হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
২১ মার্চ ১৯৪৮, ঢাকায় এক জনসভায় জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান প্রকাশ করেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির chronology-তেও ওই তারিখে ঢাকায় তার ভাষণ এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান নথিবদ্ধ রয়েছে।
পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়ায় এই অবস্থান বিরোধিতার মুখে পড়ে এবং ভাষার প্রশ্ন পরবর্তী কয়েক বছরে পূর্ববাংলার রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
স্বাধীনতার সময় জিন্নাহর স্বাস্থ্যের অবস্থা দুর্বল ছিল। ১ জুলাই ১৯৪৮ State Bank of Pakistan-এর উদ্বোধন ছিল তার শেষ উল্লেখযোগ্য প্রকাশ্য অনুষ্ঠান। ১৪ জুলাই তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে জিয়ারতে যান; আগস্টে কোয়েটায় ফিরে চিকিৎসাধীন থাকেন।
১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮, মাত্র ৭১ বছর বয়সে করাচিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মারা যান। পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর তার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র প্রায় ১৩ মাস পর মারা যান।
গুরুত্বপূর্ণ সাল-তারিখ এক নজরে
| সাল/তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬ | করাচিতে জন্ম |
| ৩০ জানুয়ারি ১৮৯২ | ইংল্যান্ড যাত্রা |
| ১৮৯৫ | Lincoln’s Inn থেকে Bar-এ অন্তর্ভুক্ত |
| ১৯০৬ | কংগ্রেসের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ |
| ১০ অক্টোবর ১৯১৩ | মুসলিম লীগে যোগদান |
| ৩০–৩১ ডিসেম্বর ১৯১৬ | Lucknow Pact-এর সময় মুসলিম লীগ অধিবেশনে সভাপতিত্ব |
| ২৮ ডিসেম্বর ১৯২০ | কংগ্রেস থেকে সরে যান |
| ২৮ মার্চ ১৯২৯ | Fourteen Points উপস্থাপন |
| ১৯৩১–৩৫ | লন্ডনে অবস্থান ও আইনচর্চা |
| এপ্রিল ১৯৩৪ | মুসলিম লীগের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন |
| ২৩ মার্চ ১৯৪০ | এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন |
| ৯–২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ | Gandhi–Jinnah Talks |
| ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ | Direct Action Day; কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা |
| ৩ জুন ১৯৪৭ | Mountbatten Partition Plan ঘোষণা |
| ১৮ জুলাই ১৯৪৭ | Indian Independence Act |
| ১১ আগস্ট ১৯৪৭ | পাকিস্তান গণপরিষদের সভাপতি নির্বাচিত ও ঐতিহাসিক ভাষণ |
| ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ | পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠান |
| ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ | প্রথম Governor-General হিসেবে শপথ |
| ২১ মার্চ ১৯৪৮ | ঢাকায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য |
| ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ | করাচিতে মৃত্যু |
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনকে মূলত তিনটি পর্বে দেখা যায়: প্রথমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা; এরপর মুসলমানদের পৃথক সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার রাজনীতি; এবং শেষ পর্যায়ে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব। এই রূপান্তর প্রায় চার দশকের ভারতীয় সাংবিধানিক সংকট, ঔপনিবেশিক শাসন, কংগ্রেস-লীগ বিরোধ এবং ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভেতরে ঘটেছিল।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে জিন্নাহ ‘Quaid-e-Azam’ ও রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণীয়। অন্যদিকে ভারত ভাগ, Direct Action Day, সংখ্যালঘু প্রশ্ন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসচর্চায় বিতর্ক ও ভিন্ন ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে আছে। এসব প্রশ্নে ঐতিহাসিক উৎস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান আলাদা করে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।








