নিখোঁজ প্রায় ১০০০; নতুন করে বন্যার আশঙ্কা
নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান: মৃত ৫৪৭
- আপডেট সময় ০৫:২৭:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ৩১ বার পড়া হয়েছে
হিমবাহ ও শিলাধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক জলস্রোতে নেপালের উত্তরাঞ্চল বিপর্যস্ত। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীপথ ধরে বহু কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই তিব্বত সীমান্তে তৈরি হওয়া একটি ‘ব্যারিয়ার লেক’ থেকে নতুন ঢল নামায় নদীতীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কাঠমান্ডু | ২৮ আগস্ট ২০২৬
নেপালের চীন-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্যে, বুধবারের দুর্যোগের পর ৫৪৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ—এনডিআরআরএমএ জানিয়েছে, আরও ৯৭৭ জনের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি মরদেহ পাওয়া গেছে বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক দূরে, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর নিম্নপ্রবাহে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ানে ২২১টি, নওয়ালপুরে ১৩৪টি, ধাদিংয়ে ৪০টি, নুয়াকোটে ৩৮টি এবং রাসুয়াসহ অন্যান্য জেলায় আরও বহু মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রবল স্রোত মানুষ ও ধ্বংসাবশেষকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে বহু দূর পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।
কীভাবে ঘটল ভয়াবহ এই বিপর্যয়
দুর্যোগের শুরু বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে। প্রথমে কম্পন শনাক্ত হওয়ায় ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS জানায়, কম্পনটি আসলে একটি বিরাট হিমবাহ ও শিলাধসের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। এর শক্তি এত বেশি ছিল যে সিসমিক যন্ত্রে তা প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য সংকেত তৈরি করে।
BBC-কে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, উচ্চ হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, শিলা ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে লেন্দে খোলা নদীতে পড়ে। এটি ভোটেকোশীর একটি উপনদী। সেই ধস নদীর প্রবাহকে আচমকা ভয়াবহ জলস্রোতে রূপ দেয়। ICIMOD-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কয়েকটি স্থানে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা সাত থেকে নয় মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়; প্রবল স্রোতে কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও ভেসে যায়।
CNN-এর বিশ্লেষণে বিপর্যয়ের ভয়াবহ গতিও উঠে এসেছে। স্যাটেলাইট ছবি ও বিজ্ঞানীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া হিমবাহ ও শিলার অংশটি প্রায় ৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। প্রাথমিক হিসাবে জল, বরফ ও পাথরের প্রথম ধাক্কাটি প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে গড়ে ঘণ্টায় ১৯৩ কিলোমিটার গতিতে। ফলে নিচের সরু উপত্যকাগুলোয় থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময় ছিল অত্যন্ত কম।
রাসুয়া থেকে নুয়াকোট—ধ্বংসের দীর্ঘ পথ
সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে রাসুয়া জেলার তিমুরে ও সিয়াফ্রুবেসি এবং সেখান থেকে নিচের দিকে নুয়াকোটসহ ত্রিশূলী নদীতীরবর্তী এলাকায়। আকস্মিক ঢলে বাড়িঘর, যানবাহন, সেতু ও সড়ক কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায়। কিছু এলাকায় নদীর পাড় এমনভাবে ভেঙেছে যে অক্ষত ভবনও এখন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
CNN-এর প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সীমান্ত ক্রসিংয়ের বহুতল ভবন, সেতু ও সড়কের ওপর কয়েকতলা উঁচু কাদা-পানি ও ধ্বংসাবশেষের ঢেউ আছড়ে পড়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বিপর্যয়ের প্রথম দিকে অনেক এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতিও জানা সম্ভব হয়নি।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, রাসুয়া থেকে শুরু হওয়া বন্যার প্রবাহ ভোটেকোশী হয়ে ত্রিশূলী এবং পরে আরও দক্ষিণের নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে চিতওয়ান, তানাহুন, গোরখা ও নওয়ালপরাসির মতো দূরের জেলাগুলো থেকেও।
শত শত বিদেশিও নিখোঁজ
নিখোঁজদের মধ্যে নেপালি নাগরিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। এনডিআরআরএমএ-র হিসাবে, ৯৭৭ নিখোঁজের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। অঞ্চলটি ট্রেকিংয়ের পাশাপাশি তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবরগামী তীর্থযাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ হওয়ায় দুর্যোগের সময় সেখানে বিভিন্ন দেশের পর্যটক উপস্থিত ছিলেন।
কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে অন্তত ১১৭ বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ভারতীয়, চীনা, দক্ষিণ কোরীয়, মার্কিন ও ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন।
চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ফলে এটি এখন কেবল নেপালের নয়, একটি বড় আন্তঃসীমান্ত হিমালয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।
উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকা থেকে আহত ও আটকে পড়া মানুষদের সরিয়ে আনা হচ্ছে। তবে বহু সড়ক ও সেতু ভেসে যাওয়ায় স্থলপথে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
Al Jazeera জানিয়েছে, বন্যায় কিছু এলাকায় প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং বহু দুর্গম স্থানে হেলিকপ্টার ছাড়া পৌঁছানোর কার্যকর উপায় নেই। দুর্গতদের কাছে খাবার, পানি ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাসুয়ার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া লোকজনকেও উদ্ধারের চেষ্টা করছে নেপালি সেনাবাহিনী। কাদা ও ধ্বংসাবশেষে টানেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় অভিযানটি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
নতুন বিপদ: আবারও নামছে পানি
উদ্ধার অভিযান চলতে চলতেই শুক্রবার নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রথম বিপর্যয়ের পর তিব্বতের চোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে ধ্বংসাবশেষ জমে একটি বড় প্রাকৃতিক ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছিল। চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বৃহস্পতিবার সকালে এতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি ছিল এবং পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
শুক্রবার নেপালি কর্মকর্তারা জানান, ওই হ্রদের বাঁধসদৃশ অংশ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরে নেপালের Flood Forecasting Division জানায়, নতুন ঢলের পানি দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে সিয়াফ্রুবেসিতে পৌঁছেছে। এরপর ত্রিশূলী নদীর পাড় ধরে মুগলিং পর্যন্ত মানুষকে সতর্ক থাকতে এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
তবে নতুন হ্রদ থেকে ঠিক কত পানি বেরিয়েছে এবং সেটি আরেকটি বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে কি না—এ বিষয়ে নেপালের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য এখনো পুরোপুরি এক নয়। কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যবেক্ষণে হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশপথে পরিস্থিতি যাচাই করছে এবং নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যোগসূত্র
বিজ্ঞানীরা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে ঘোষণা করতে সতর্ক থাকলেও হিমালয়ের দ্রুত উষ্ণায়নকে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে দেখছেন। BBC-র প্রতিবেদনে উদ্ধৃত গবেষণা বলছে, হিন্দুকুশ-হিমালয়ের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের পর থেকে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। বরফ ও স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি গলে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢাল আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে।
CNN-কে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা হিমবাহকে ছোট ও অস্থিতিশীল করে দেয় এবং এর ফলে এ ধরনের হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে এবারের বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ ও এত বিপুল পানির উৎস জানতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপাল সরকারের সামনে এখন একই সঙ্গে কয়েকটি সংকট—নিখোঁজ প্রায় এক হাজার মানুষকে খুঁজে বের করা, শত শত মরদেহ শনাক্ত করা, বিচ্ছিন্ন জনপদে খাদ্য ও চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করা। বহু মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ছবি, আঙুলের ছাপ, ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরকার বন্যাকবলিত ব্যক্তি ও ব্যবসার জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা এক মাসের বেতন দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারত ইতোমধ্যে কয়েক দফায় ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও জরুরি সহায়তা ঘোষণা করেছে।
২৮ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে ৫৪৭টি মরদেহ উদ্ধার এবং এনডিআরআরএমএ-র হিসাবে ৯৭৭ জন নিখোঁজ। উদ্ধার অভিযান যত নতুন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে, সংখ্যাগুলোও দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই পরবর্তী সরকারি আপডেটে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা সংশোধিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।








