ঢাকা ০৬:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই বিপ্লবে নজরুল: বিদ্রোহের শতবর্ষী সুরে নতুন প্রজন্মের জাগরণ

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০১:২৯:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৪৯ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে কবিতা ও গান কখনো নিছক বিনোদন ছিল না; বহুবার তা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, সাহসের উৎস এবং মানুষের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন প্রজন্ম তাদের নিজস্ব স্লোগান, গ্রাফিতি, র‌্যাপ, গান ও ডিজিটাল সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই নতুন ভাষার মধ্যেই প্রবলভাবে ফিরে এসেছিলেন শতবর্ষ আগের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

জুলাইয়ের রাজপথে যখন তরুণেরা বৈষম্য, নিপীড়ন ও ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তখন নজরুলের বিদ্রোহ, সাম্য, মুক্তি ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দর্শন নতুন করে তাৎপর্য পেয়েছে। বিশেষ করে ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘এই শিকল-পরা ছল’, ‘চল্ চল্ চল্’ এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’—নজরুলের এসব সংগ্রামী গান আন্দোলনের মিছিল, কণ্ঠ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেয়ালের গ্রাফিতিতে বিভিন্নভাবে ফিরে এসেছে।

জুলাইয়ের রাজপথে যে নজরুলের গানগুলো ফিরে এসেছিল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের উপস্থিতি কোনো বিমূর্ত সাহিত্যিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কয়েকটি গান সরাসরি আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে, আবৃত্তিতে কিংবা দেয়ালের লেখায় স্থান পেয়েছিল।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’—শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক

জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে দৃশ্যমান নজরুল-রচনাগুলোর একটি ছিল ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’। আন্দোলনের সময়ে গানটির অংশ স্লোগান ও গ্রাফিতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের গ্রাফিতি নিয়ে করা বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেয়ালে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ লেখা থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়।

গানটির কয়েকটি শব্দই যেন আন্দোলনের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করেছিল—

“কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল্ কর্ রে লোপাট”

মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রচিত এই গান এক শতাব্দী পরে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে। ‘কারা’ কিংবা ‘শিকল’ এখানে শুধু বাস্তব কারাগারের প্রতীক নয়; তা ভয়, দমন, বৈষম্য ও স্বাধীন মতপ্রকাশের পথে বাধার প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব।

এখানেই নজরুলের সৃষ্টির কালোত্তীর্ণ শক্তি। যে বাণী একসময় ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মানুষকে আলোড়িত করেছিল, সেটিই জুলাইয়ের তরুণদের কাছে আবার প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।

‘এই শিকল-পরা ছল’—ভয়কে পরাজিত করার গান

জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আরেকটি নজরুলসংগীত ‘এই শিকল-পরা ছল’

নজরুল লিখেছিলেন—

“এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল,
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”

জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত পরবর্তী বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের দিনগুলোতে দেয়ালে এই গানের বাণী লেখা হয়েছিল এবং নজরুলের এই গান আন্দোলনের মাঠেও উচ্চারিত হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনের আবহে ‘এই শিকল-পরা ছল’ নতুনভাবে গেয়েছেন শেখ ইশতিয়াক, শাকিব চৌধুরী, রায়েফ আল হাসান রাফা, প্রবর রিপন ও জামশেদ চৌধুরীর মতো শিল্পীরা—যা নজরুলের শতবর্ষী প্রতিবাদী সুরকে সমকালীন সংগীতের ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।

এই গানের মূল শক্তি শুধু শিকলের বিরুদ্ধে ক্ষোভে নয়; বরং শিকলকেই প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তরের দর্শনে। দমন মানুষকে থামাবে—এই ধারণাকে উল্টে দিয়ে নজরুল দেখিয়েছেন, অত্যাচারই কখনো কখনো প্রতিবাদকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

জুলাইয়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই বক্তব্যের মিল ছিল গভীর।

‘চল্ চল্ চল্’—তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান

নজরুলের বিখ্যাত রণসংগীত ‘চল্ চল্ চল্’-এর আবেদনও জুলাইয়ের তরুণদের মধ্যে ফিরে আসে।

“ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণীতল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল—
চল্ রে চল্ রে চল্।”

জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত একটি বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে শাহবাগমুখী শিক্ষার্থীদের মিছিলে নজরুলের ‘চল্ চল্’ উচ্চারিত হয়েছিল।

এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গানটির কেন্দ্রে রয়েছে ‘তরুণ দল’। নজরুল তাঁর সময়েই তরুণদের পরিবর্তনের অগ্রবর্তী শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। প্রায় এক শতাব্দী পরে ছাত্রনেতৃত্বাধীন একটি আন্দোলনের মিছিলে সেই একই আহ্বানের পুনরাবৃত্তি ইতিহাসের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করে।

‘চল্ চল্ চল্’ শুধু সামনে হাঁটার আহ্বান নয়; স্থবিরতা ভাঙা, ভয় অতিক্রম করা এবং লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে না যাওয়ার আহ্বানও।

‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’—কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস

জুলাইয়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আঁকা গ্রাফিতিতে নজরুলের আরেকটি বিখ্যাত গানের পঙ্‌ক্তি দেখা গেছে—

“দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে…”

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের একটি প্রতিবেদনে জুলাই-সংক্রান্ত দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতির মধ্যে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর পাশাপাশি ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে’ লেখাটিও থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গানটির মূল ভাবনায় রয়েছে দুর্যোগপূর্ণ ও বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া। তাই আন্দোলনের কঠিন মুহূর্তে এ গানের প্রতীকী তাৎপর্য স্পষ্ট—সামনে বাধা যত কঠিনই হোক, পথ অতিক্রম করতেই হবে।

বাংলাপিডিয়াও ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’ এবং ‘শিকল পরা ছল’-কে নজরুলের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপনামূলক গানের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

শতবর্ষ পেরিয়েও কেন এত জীবন্ত নজরুল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নজরুলকে শুধু একজন কবি কিংবা সংগীতস্রষ্টা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁকে বুঝতে হবে তাঁর সময়ের একজন প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বৈষম্য ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুল যে সাহিত্য ও সংগীত সৃষ্টি করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি। তাঁর কাছে বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মমর্যাদার ঘোষণা।

তাই ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ কিংবা ‘এই শিকল-পরা ছল’কে শুধু ব্রিটিশবিরোধী সময়ের গান হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যায় না। যতবার মানুষ দমন বা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে, ততবার এসব গানের নতুন অর্থ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

জুলাইয়ের আন্দোলন সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই একটি নতুন অধ্যায়।

নতুন প্রজন্ম, পুরোনো গান—তবু নতুন অর্থ

২০২৪ সালের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তরুণ প্রজন্মের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষা। তাদের প্রতিবাদের মাধ্যম ছিল শুধু মিছিলের প্রচলিত গান নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও, র‌্যাপ, মিম, গ্রাফিতি, পোস্টার ও নতুন গান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

‘কথা ক’, ‘আওয়াজ উডা’সহ বেশ কয়েকটি সমকালীন র‌্যাপ গান জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। আন্দোলনে র‌্যাপ যে তরুণদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল, তা নিয়েও বিশ্লেষণ হয়েছে।

কিন্তু নতুন প্রতিবাদী সংগীতের উত্থান নজরুলকে অপ্রাসঙ্গিক করেনি।

বরং জুলাইয়ে একটি অসাধারণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেখা গেছে—একদিকে শতবর্ষ পুরোনো ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘এই শিকল-পরা ছল’, ‘চল্ চল্ চল্’ ও ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’, অন্যদিকে একেবারে সমকালীন র‌্যাপ ও স্বাধীন সংগীত।

প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও মূল জায়গায় রয়েছে এক অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা।

গান যখন ভয় ভাঙার শক্তি

গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ভয়। একজন মানুষ হয়তো একা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না; কিন্তু হাজার মানুষ যখন একই কথা উচ্চারণ করে কিংবা একই গান গায়, তখন ব্যক্তিগত ভয় সম্মিলিত সাহসে পরিণত হতে পারে।

প্রতিবাদী গানের রাজনৈতিক শক্তি এখানেই।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ শৃঙ্খল ভাঙতে বলে।

‘এই শিকল-পরা ছল’ বলে, শিকলই একদিন শিকল ভাঙার অস্ত্র হবে।

‘চল্ চল্ চল্’ থেমে না থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

আর ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’ কঠিন পথ অতিক্রম করার সাহস দেয়।

চারটি গানের ভাষা আলাদা হলেও তাদের অন্তর্নিহিত বার্তা একই জায়গায় এসে মিলেছে—ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়।

এ কারণেই জুলাইয়ের মতো ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এসব গানের আবেদন এত স্বাভাবিকভাবে ফিরে এসেছে।

নজরুলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সাম্য

জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে রেখে। পরবর্তী সময়ে এর পরিসর বিস্তৃত হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিতে রূপ নেয়।

এখানেই নজরুলের সাম্যদর্শনের সঙ্গে জুলাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।

নজরুলের কাছে সাম্য কোনো অলংকারমূলক শব্দ ছিল না। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। তাঁর সাহিত্যে মানুষই ছিল প্রধান পরিচয়।

ফলে তরুণেরা যখন ‘বৈষম্যবিরোধী’ পরিচয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে, নজরুলের সাহিত্য তাদের কাছে কেবল পাঠ্যপুস্তকের বিষয় হয়ে থাকেনি। তাঁর সাম্যের দর্শন নতুন বাস্তবতায় আবারও পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে।

দেয়ালের গ্রাফিতিতে নজরুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক নিদর্শন ছিল দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি।

আন্দোলনের পর ঢাকা থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত দেয়ালে আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদদের ছবি, স্লোগান ও বিভিন্ন কবিতার পঙ্‌ক্তি উঠে আসে। বাসসের প্রতিবেদনে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ ও ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’-র মতো নজরুলের রচনা এসব গ্রাফিতিতে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।

অন্য একটি বিশ্লেষণে ‘এই শিকল-পরা ছল’-এর পঙ্‌ক্তিও জুলাইয়ের দেয়ালে উঠে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ নজরুল ছিলেন শুধু মিছিলের কণ্ঠে নন; তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন শহরের দেয়ালেও।

আর এই দেয়ালগুলোই পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের স্মৃতির এক ধরনের উন্মুক্ত দলিলে পরিণত হয়েছে।

প্রজন্ম বদলায়, প্রতিবাদের ভাষাও বদলায়

কোনো প্রজন্মই আগের প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুবহু গ্রহণ করে না। তারা নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী তার নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করে।

জুলাইয়ের তরুণদের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।

তারা নজরুলের সময়ের তরুণ নয়। তাদের জীবন প্রযুক্তিনির্ভর, যোগাযোগ তাৎক্ষণিক, সাংস্কৃতিক অভ্যাস বহুমাত্রিক। কিন্তু যখন তারা ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ দেয়ালে লিখেছে কিংবা ‘এই শিকল-পরা ছল’ নতুন সংগীতায়োজনে শুনেছে, তখন মূল নজরুলকে অক্ষত রেখেই তাঁকে নিজেদের সময়ের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছে।

এ কারণেই নজরুলের গান পুরোনো হয় না।

সুরটি শতবর্ষ পুরোনো হতে পারে, কিন্তু অন্যায়, স্বাধীনতা, ভয়, শিকল কিংবা সাম্যের প্রশ্নগুলো নতুন বাস্তবতায় আবার ফিরে এলে গানও নতুন হয়ে ওঠে।

নজরুলকে শুধু অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না

জাতীয় কবির জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর সমাধিতে ফুল দিই, আলোচনা করি, গান গাই। এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু নজরুলের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

কারণ নজরুল নিজেই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার মানুষ।

তাঁর গান গাওয়া সহজ; কিন্তু তাঁর সাম্যবোধ ধারণ করা কঠিন।

তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা সহজ; কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করা কঠিন।

তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলা সহজ; কিন্তু সমাজে বৈষম্য ও নিপীড়ন দেখলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই তাঁর দর্শনের প্রকৃত পরীক্ষা।

জুলাই বিপ্লব তাই নজরুলকে নতুন করে পড়ার একটি সুযোগও তৈরি করেছে।

জুলাইয়ের কণ্ঠে নজরুল, ভবিষ্যতের কাছেও নজরুল

জুলাইয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা ও মতপার্থক্য ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এর সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—নতুন প্রজন্ম অতীতের সংগ্রামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল।

সেই সংযোগে নজরুল ছিলেন অন্যতম প্রধান নাম।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’-এর শিকল ভাঙার আহ্বান, ‘এই শিকল-পরা ছল’-এর ভয় জয় করার ঘোষণা, ‘চল্ চল্ চল্’-এর তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ডাক এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’-র কঠিন পথ অতিক্রমের সংকল্প—সবকিছু মিলিয়ে নজরুল যেন জুলাইয়ের প্রতিবাদী মননের জন্য আগে থেকেই একটি ভাষা তৈরি করে রেখেছিলেন।

তাই জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে জুলাই বিপ্লবের এই সাংস্কৃতিক অধ্যায় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

শতবর্ষ আগে যে কবি শিকল ভাঙার গান লিখেছিলেন, শতবর্ষ পরে বাংলাদেশের তরুণেরা সেই গানকে আবার নিজেদের সংগ্রামের ভাষায় পরিণত করেছে। এখানেই নজরুলের অমরত্ব—তিনি কেবল অতীতের বিদ্রোহী কবি নন; প্রতিটি নতুন জাগরণে ফিরে আসা এক অনিবার্য কণ্ঠ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জুলাই বিপ্লবে নজরুল: বিদ্রোহের শতবর্ষী সুরে নতুন প্রজন্মের জাগরণ

আপডেট সময় ০১:২৯:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে কবিতা ও গান কখনো নিছক বিনোদন ছিল না; বহুবার তা হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা, সাহসের উৎস এবং মানুষের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন প্রজন্ম তাদের নিজস্ব স্লোগান, গ্রাফিতি, র‌্যাপ, গান ও ডিজিটাল সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই নতুন ভাষার মধ্যেই প্রবলভাবে ফিরে এসেছিলেন শতবর্ষ আগের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

জুলাইয়ের রাজপথে যখন তরুণেরা বৈষম্য, নিপীড়ন ও ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তখন নজরুলের বিদ্রোহ, সাম্য, মুক্তি ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দর্শন নতুন করে তাৎপর্য পেয়েছে। বিশেষ করে ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘এই শিকল-পরা ছল’, ‘চল্ চল্ চল্’ এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’—নজরুলের এসব সংগ্রামী গান আন্দোলনের মিছিল, কণ্ঠ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেয়ালের গ্রাফিতিতে বিভিন্নভাবে ফিরে এসেছে।

জুলাইয়ের রাজপথে যে নজরুলের গানগুলো ফিরে এসেছিল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের উপস্থিতি কোনো বিমূর্ত সাহিত্যিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কয়েকটি গান সরাসরি আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে, আবৃত্তিতে কিংবা দেয়ালের লেখায় স্থান পেয়েছিল।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’—শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক

জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে দৃশ্যমান নজরুল-রচনাগুলোর একটি ছিল ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’। আন্দোলনের সময়ে গানটির অংশ স্লোগান ও গ্রাফিতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের গ্রাফিতি নিয়ে করা বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেয়ালে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ লেখা থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়।

গানটির কয়েকটি শব্দই যেন আন্দোলনের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করেছিল—

“কারার ঐ লৌহ-কপাট
ভেঙে ফেল্ কর্ রে লোপাট”

মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রচিত এই গান এক শতাব্দী পরে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে। ‘কারা’ কিংবা ‘শিকল’ এখানে শুধু বাস্তব কারাগারের প্রতীক নয়; তা ভয়, দমন, বৈষম্য ও স্বাধীন মতপ্রকাশের পথে বাধার প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা সম্ভব।

এখানেই নজরুলের সৃষ্টির কালোত্তীর্ণ শক্তি। যে বাণী একসময় ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মানুষকে আলোড়িত করেছিল, সেটিই জুলাইয়ের তরুণদের কাছে আবার প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।

‘এই শিকল-পরা ছল’—ভয়কে পরাজিত করার গান

জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আরেকটি নজরুলসংগীত ‘এই শিকল-পরা ছল’

নজরুল লিখেছিলেন—

“এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল,
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”

জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত পরবর্তী বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের দিনগুলোতে দেয়ালে এই গানের বাণী লেখা হয়েছিল এবং নজরুলের এই গান আন্দোলনের মাঠেও উচ্চারিত হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনের আবহে ‘এই শিকল-পরা ছল’ নতুনভাবে গেয়েছেন শেখ ইশতিয়াক, শাকিব চৌধুরী, রায়েফ আল হাসান রাফা, প্রবর রিপন ও জামশেদ চৌধুরীর মতো শিল্পীরা—যা নজরুলের শতবর্ষী প্রতিবাদী সুরকে সমকালীন সংগীতের ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়।

এই গানের মূল শক্তি শুধু শিকলের বিরুদ্ধে ক্ষোভে নয়; বরং শিকলকেই প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তরের দর্শনে। দমন মানুষকে থামাবে—এই ধারণাকে উল্টে দিয়ে নজরুল দেখিয়েছেন, অত্যাচারই কখনো কখনো প্রতিবাদকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

জুলাইয়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই বক্তব্যের মিল ছিল গভীর।

‘চল্ চল্ চল্’—তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান

নজরুলের বিখ্যাত রণসংগীত ‘চল্ চল্ চল্’-এর আবেদনও জুলাইয়ের তরুণদের মধ্যে ফিরে আসে।

“ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণীতল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল—
চল্ রে চল্ রে চল্।”

জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত একটি বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে শাহবাগমুখী শিক্ষার্থীদের মিছিলে নজরুলের ‘চল্ চল্’ উচ্চারিত হয়েছিল।

এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গানটির কেন্দ্রে রয়েছে ‘তরুণ দল’। নজরুল তাঁর সময়েই তরুণদের পরিবর্তনের অগ্রবর্তী শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। প্রায় এক শতাব্দী পরে ছাত্রনেতৃত্বাধীন একটি আন্দোলনের মিছিলে সেই একই আহ্বানের পুনরাবৃত্তি ইতিহাসের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করে।

‘চল্ চল্ চল্’ শুধু সামনে হাঁটার আহ্বান নয়; স্থবিরতা ভাঙা, ভয় অতিক্রম করা এবং লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে না যাওয়ার আহ্বানও।

‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’—কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস

জুলাইয়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আঁকা গ্রাফিতিতে নজরুলের আরেকটি বিখ্যাত গানের পঙ্‌ক্তি দেখা গেছে—

“দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে…”

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের একটি প্রতিবেদনে জুলাই-সংক্রান্ত দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতির মধ্যে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর পাশাপাশি ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে’ লেখাটিও থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গানটির মূল ভাবনায় রয়েছে দুর্যোগপূর্ণ ও বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া। তাই আন্দোলনের কঠিন মুহূর্তে এ গানের প্রতীকী তাৎপর্য স্পষ্ট—সামনে বাধা যত কঠিনই হোক, পথ অতিক্রম করতেই হবে।

বাংলাপিডিয়াও ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’ এবং ‘শিকল পরা ছল’-কে নজরুলের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপনামূলক গানের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

শতবর্ষ পেরিয়েও কেন এত জীবন্ত নজরুল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নজরুলকে শুধু একজন কবি কিংবা সংগীতস্রষ্টা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁকে বুঝতে হবে তাঁর সময়ের একজন প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বৈষম্য ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুল যে সাহিত্য ও সংগীত সৃষ্টি করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি। তাঁর কাছে বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মমর্যাদার ঘোষণা।

তাই ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ কিংবা ‘এই শিকল-পরা ছল’কে শুধু ব্রিটিশবিরোধী সময়ের গান হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যায় না। যতবার মানুষ দমন বা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে, ততবার এসব গানের নতুন অর্থ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

জুলাইয়ের আন্দোলন সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই একটি নতুন অধ্যায়।

নতুন প্রজন্ম, পুরোনো গান—তবু নতুন অর্থ

২০২৪ সালের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তরুণ প্রজন্মের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষা। তাদের প্রতিবাদের মাধ্যম ছিল শুধু মিছিলের প্রচলিত গান নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও, র‌্যাপ, মিম, গ্রাফিতি, পোস্টার ও নতুন গান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

‘কথা ক’, ‘আওয়াজ উডা’সহ বেশ কয়েকটি সমকালীন র‌্যাপ গান জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। আন্দোলনে র‌্যাপ যে তরুণদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল, তা নিয়েও বিশ্লেষণ হয়েছে।

কিন্তু নতুন প্রতিবাদী সংগীতের উত্থান নজরুলকে অপ্রাসঙ্গিক করেনি।

বরং জুলাইয়ে একটি অসাধারণ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেখা গেছে—একদিকে শতবর্ষ পুরোনো ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘এই শিকল-পরা ছল’, ‘চল্ চল্ চল্’ ও ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’, অন্যদিকে একেবারে সমকালীন র‌্যাপ ও স্বাধীন সংগীত।

প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও মূল জায়গায় রয়েছে এক অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা।

গান যখন ভয় ভাঙার শক্তি

গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ভয়। একজন মানুষ হয়তো একা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না; কিন্তু হাজার মানুষ যখন একই কথা উচ্চারণ করে কিংবা একই গান গায়, তখন ব্যক্তিগত ভয় সম্মিলিত সাহসে পরিণত হতে পারে।

প্রতিবাদী গানের রাজনৈতিক শক্তি এখানেই।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ শৃঙ্খল ভাঙতে বলে।

‘এই শিকল-পরা ছল’ বলে, শিকলই একদিন শিকল ভাঙার অস্ত্র হবে।

‘চল্ চল্ চল্’ থেমে না থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

আর ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’ কঠিন পথ অতিক্রম করার সাহস দেয়।

চারটি গানের ভাষা আলাদা হলেও তাদের অন্তর্নিহিত বার্তা একই জায়গায় এসে মিলেছে—ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়।

এ কারণেই জুলাইয়ের মতো ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এসব গানের আবেদন এত স্বাভাবিকভাবে ফিরে এসেছে।

নজরুলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—সাম্য

জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে রেখে। পরবর্তী সময়ে এর পরিসর বিস্তৃত হয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিতে রূপ নেয়।

এখানেই নজরুলের সাম্যদর্শনের সঙ্গে জুলাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।

নজরুলের কাছে সাম্য কোনো অলংকারমূলক শব্দ ছিল না। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। তাঁর সাহিত্যে মানুষই ছিল প্রধান পরিচয়।

ফলে তরুণেরা যখন ‘বৈষম্যবিরোধী’ পরিচয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে, নজরুলের সাহিত্য তাদের কাছে কেবল পাঠ্যপুস্তকের বিষয় হয়ে থাকেনি। তাঁর সাম্যের দর্শন নতুন বাস্তবতায় আবারও পাঠযোগ্য হয়ে উঠেছে।

দেয়ালের গ্রাফিতিতে নজরুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক নিদর্শন ছিল দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি।

আন্দোলনের পর ঢাকা থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত দেয়ালে আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদদের ছবি, স্লোগান ও বিভিন্ন কবিতার পঙ্‌ক্তি উঠে আসে। বাসসের প্রতিবেদনে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ ও ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’-র মতো নজরুলের রচনা এসব গ্রাফিতিতে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।

অন্য একটি বিশ্লেষণে ‘এই শিকল-পরা ছল’-এর পঙ্‌ক্তিও জুলাইয়ের দেয়ালে উঠে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ নজরুল ছিলেন শুধু মিছিলের কণ্ঠে নন; তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন শহরের দেয়ালেও।

আর এই দেয়ালগুলোই পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের স্মৃতির এক ধরনের উন্মুক্ত দলিলে পরিণত হয়েছে।

প্রজন্ম বদলায়, প্রতিবাদের ভাষাও বদলায়

কোনো প্রজন্মই আগের প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুবহু গ্রহণ করে না। তারা নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী তার নতুন ব্যাখ্যা তৈরি করে।

জুলাইয়ের তরুণদের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।

তারা নজরুলের সময়ের তরুণ নয়। তাদের জীবন প্রযুক্তিনির্ভর, যোগাযোগ তাৎক্ষণিক, সাংস্কৃতিক অভ্যাস বহুমাত্রিক। কিন্তু যখন তারা ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ দেয়ালে লিখেছে কিংবা ‘এই শিকল-পরা ছল’ নতুন সংগীতায়োজনে শুনেছে, তখন মূল নজরুলকে অক্ষত রেখেই তাঁকে নিজেদের সময়ের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছে।

এ কারণেই নজরুলের গান পুরোনো হয় না।

সুরটি শতবর্ষ পুরোনো হতে পারে, কিন্তু অন্যায়, স্বাধীনতা, ভয়, শিকল কিংবা সাম্যের প্রশ্নগুলো নতুন বাস্তবতায় আবার ফিরে এলে গানও নতুন হয়ে ওঠে।

নজরুলকে শুধু অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না

জাতীয় কবির জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর সমাধিতে ফুল দিই, আলোচনা করি, গান গাই। এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু নজরুলের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

কারণ নজরুল নিজেই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার মানুষ।

তাঁর গান গাওয়া সহজ; কিন্তু তাঁর সাম্যবোধ ধারণ করা কঠিন।

তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা সহজ; কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করা কঠিন।

তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলা সহজ; কিন্তু সমাজে বৈষম্য ও নিপীড়ন দেখলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই তাঁর দর্শনের প্রকৃত পরীক্ষা।

জুলাই বিপ্লব তাই নজরুলকে নতুন করে পড়ার একটি সুযোগও তৈরি করেছে।

জুলাইয়ের কণ্ঠে নজরুল, ভবিষ্যতের কাছেও নজরুল

জুলাইয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা ও মতপার্থক্য ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এর সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—নতুন প্রজন্ম অতীতের সংগ্রামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল।

সেই সংযোগে নজরুল ছিলেন অন্যতম প্রধান নাম।

‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’-এর শিকল ভাঙার আহ্বান, ‘এই শিকল-পরা ছল’-এর ভয় জয় করার ঘোষণা, ‘চল্ চল্ চল্’-এর তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ডাক এবং ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু’-র কঠিন পথ অতিক্রমের সংকল্প—সবকিছু মিলিয়ে নজরুল যেন জুলাইয়ের প্রতিবাদী মননের জন্য আগে থেকেই একটি ভাষা তৈরি করে রেখেছিলেন।

তাই জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে জুলাই বিপ্লবের এই সাংস্কৃতিক অধ্যায় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

শতবর্ষ আগে যে কবি শিকল ভাঙার গান লিখেছিলেন, শতবর্ষ পরে বাংলাদেশের তরুণেরা সেই গানকে আবার নিজেদের সংগ্রামের ভাষায় পরিণত করেছে। এখানেই নজরুলের অমরত্ব—তিনি কেবল অতীতের বিদ্রোহী কবি নন; প্রতিটি নতুন জাগরণে ফিরে আসা এক অনিবার্য কণ্ঠ।