আজ ১২ ভাদ্র: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী
- আপডেট সময় ০১:১৬:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
- / ১১ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা, ২৭ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার: আজ ১২ ভাদ্র। বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও বাঙালির মুক্তচিন্তার ইতিহাসে অসামান্য অবদান রাখা এই কবিকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে জাতি।
১৯৭৬ সালের ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ, ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে—বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে—শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বর্তমান বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বাংলাদেশে ১২ ভাদ্র তথা ২৭ আগস্ট তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।
দেশজুড়ে নানা আয়োজনে স্মরণ
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ‘মসজিদুল জামিয়া’-তে বাদ ফজর কোরআনখানির মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রা করে কবির সমাধিতে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সমাধি প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা ও স্মারক বক্তৃতার আয়োজনও করা হয়েছে।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউট আয়োজন করেছে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং হামদ-নাতের অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার মাধ্যমেও কবিকে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত জীবনী
কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন কাজী ফকির আহমদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’।
মাত্র নয় বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় নজরুলকে। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, কখনো মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অল্প বয়সেই তিনি গ্রামের লেটো গানের দলে যুক্ত হন। সেখানে গান ও পালা রচনা এবং অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য ও সংগীত প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে।
সৈনিক জীবন থেকে সাহিত্যাঙ্গনে
কৈশোর ও তরুণ বয়সে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নজরুল একসময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাজীবন তাঁর চিন্তা, সাহিত্যবোধ ও বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে উপলব্ধিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
সেনাবাহিনী থেকে ফিরে কলকাতায় সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় হন তিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কবিতা, গল্প, গান ও প্রবন্ধ সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
১৯২১ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠের কারণে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠ
নজরুল শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে এক সাহসী কণ্ঠ।
তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত রাজনৈতিক লেখা এবং বিভিন্ন কবিতা ও প্রবন্ধ ব্রিটিশ শাসকদের ক্ষুব্ধ করে। তাঁর লেখা নিষিদ্ধ করা হয়, পত্রিকা বন্ধ করা হয় এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।
কারাগারে থেকেও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থামাননি। সেখানে রচনা করেন বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। কারাগারের নিপীড়নের প্রতিবাদে তিনি দীর্ঘ অনশনও করেছিলেন।
সাম্য ও মানবতার কবি
নজরুলের সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা লিঙ্গের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার।
‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘নারী’ প্রভৃতি কবিতায় তিনি মানুষের সমান অধিকার, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলেছেন।
হিন্দু ও মুসলিম—উভয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে ব্যবহার করেছেন। বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দের পাশাপাশি সংস্কৃত ও পুরাণের উপাদানের সম্মিলন ঘটিয়ে তিনি অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
বাংলা সংগীতে নজরুলের বিপুল অবদান
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সংগীতেরও অন্যতম প্রধান স্রষ্টা। তিনি তিন হাজারের বেশি গান রচনা ও বহু গানে সুরারোপ করেছেন। তাঁর সৃষ্ট গানগুলো পরবর্তীকালে ‘নজরুলগীতি’ বা ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রেম, প্রকৃতি, দেশাত্মবোধ, মানবতা, বিদ্রোহ, আধ্যাত্মিকতা থেকে শুরু করে ইসলামী সংগীত, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, গজল—বাংলা গানের প্রায় প্রতিটি ধারাতেই রয়েছে তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি।
বাংলা গজলের বিকাশ এবং বাংলা ভাষায় হামদ, নাত ও ইসলামী সংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলতেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে শ্যামাসংগীতসহ হিন্দু ধর্মীয় ভাবধারার অসংখ্য গান রচনা তাঁর অসাম্প্রদায়িক সৃষ্টিসত্তার পরিচয় বহন করে।
কবির উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম
নজরুলের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণিমনসা’, ‘ছায়ানট’, ‘প্রলয় শিখা’ প্রভৃতি।
তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে ‘বিদ্রোহী’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘নারী’, ‘দারিদ্র্য’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও সংগীত—সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
দীর্ঘ ৩৪ বছরের নীরব জীবন
১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কাজী নজরুল ইসলাম। ধীরে ধীরে তাঁর বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে-বিদেশে চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও তাঁর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
১৯৪২ সালের জুলাই থেকে ১৯৭৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ বছর কবির জীবন কেটেছে কার্যত নীরবতায়।
স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুল
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে।
১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং একই বছর তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
১২ ভাদ্রে চিরবিদায়
১৯৭৬ সালের ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি। তাঁর একটি গানে তিনি লিখেছিলেন—
“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই”
তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আজও তাঁর সমাধি বাঙালির শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম কেন্দ্র।
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের চেতনায় নজরুল
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের কবিতা ও গান মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর বিদ্রোহী উচ্চারণ, শোষণবিরোধী দর্শন এবং সাম্যের আহ্বান স্বাধীনতার সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছে। পরবর্তী বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তাঁর রচনা মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
নজরুলের কাছে স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ছিল না; তাঁর সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও মর্যাদার স্বাধীনতার দাবি।
অর্ধশতাব্দী পরও প্রাসঙ্গিক নজরুল
কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পেরোলেও তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের আবেদন এতটুকু কমেনি। সমাজে বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন, শোষণ, নিপীড়ন কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা আজও সমান শক্তিতে কথা বলে।
তিনি ছিলেন বিদ্রোহের কবি, আবার প্রেমের কবি; ছিলেন সাম্যের কবি, একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতির কবি। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন ধ্বনিত হয়েছে—
“গাহি সাম্যের গান—”
তেমনি মানুষের পরিচয়কে সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে তুলে ধরাই ছিল তাঁর সাহিত্যিক দর্শনের অন্যতম মূল বক্তব্য।
আজ ১২ ভাদ্রে জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই তাঁকে স্মরণ করা শুধু একজন মহান কবিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং তাঁর সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও উপলক্ষ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি এবং সাম্য ও মানবতার আহ্বান ততদিন বাঙালির চেতনায় অনুরণিত হবে।








