গ্যাসে বড় ঘাটতি, বিদ্যুতে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং; আমদানি ব্যয়ে রেকর্ড চাপ
জ্বালানি সংকট: সামনে কী?
- আপডেট সময় ০৭:২৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা, ২২ আগস্ট ২০২৬: উৎপাদন সক্ষমতা আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের চিত্র অনেকটাই এমন। একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ার মধ্যেই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বারবার বিপর্যয় ঘটছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি পরিবহন ও আবাসিক গ্যাস সরবরাহে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও রেকর্ড আমদানি ব্যয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার আরও গভীর সমস্যার ইঙ্গিত?
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯ আগস্ট থেকে আবারও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে। পরবর্তী এলএনজি কার্গো ২৩ আগস্ট আসার কথা। ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমেছে দৈনিক ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও নিচে, যেখানে চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই টার্মিনালটি গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। ৬ আগস্ট আংশিকভাবে চালু হলেও পরবর্তী সময়ে আবার কারিগরি ত্রুটি এবং এলএনজি মজুত সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগছে।
গ্যাসের ধাক্কা সরাসরি বিদ্যুতে
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে আগস্টে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ। কয়লা ২৮ শতাংশের বেশি এবং ফার্নেস অয়েল প্রায় ১৯ শতাংশ।
কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ সীমিত হওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না। ২১ আগস্ট পর্যন্ত দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পিকে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তখন প্রায় ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৫,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছিল।
আগস্টের শুরুতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছিল। ৮-১০ আগস্টের মধ্যে বিদ্যুতের ঘাটতি ২,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় এবং কোনো কোনো সময়ে গড় লোডশেডিং প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। গ্যাস ও কয়লার সীমাবদ্ধতা সামলাতে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র বেশি চালাতে হয়েছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেক সমস্যা—খরচ। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ৩.৪৮ টাকা, অথচ তেলভিত্তিক বিদ্যুতে তা প্রায় ১৮.৫৯ টাকা। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে যত বেশি তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো হবে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ ও ভর্তুকির বোঝাও তত বাড়বে।
শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে শিল্পে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানায় উৎপাদন কমেছে, কিছু ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং কোথাও শ্রমিকদের সাময়িক ছুটিতেও পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রামে সংকটের সময় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, পরিবহন সংকট এবং বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস না পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোনো কোনো এলাকায় যানবাহনের সারি এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে।
তেলের মজুত আছে, কিন্তু বড় ঝুঁকি দামে
তবে গ্যাস সংকটের সঙ্গে পেট্রোল, ডিজেল বা অকটেনের পরিস্থিতিকে এক করে দেখলে বর্তমান চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না। জ্বালানি বিভাগ গত ২২ জুলাই জানিয়েছিল, দেশে তখন ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন ডিজেল মজুত ছিল—যা প্রায় ৩১ দিনের চাহিদার সমান। অকটেন ৩৬ দিন, পেট্রোল ২০ দিন এবং ফার্নেস অয়েল প্রায় ২৫ দিনের মজুত থাকার কথাও জানানো হয়।
কিন্তু বড় উদ্বেগ মূল্য ও আমদানি ব্যয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে রেকর্ড ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ এবং দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশের বেশি গেছে জ্বালানিতে।
আন্তর্জাতিক বাজারও স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর সরবরাহ বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানি ও পরিশোধন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার এখনও চাপের মধ্যে।
এলএনজিতেও একই ঝুঁকি। কাতার থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি ক্রেতার জন্য কাতার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করেছে।
সামনে কী?
তাৎক্ষণিকভাবে এক্সিলারেটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো পৌঁছে সরবরাহ শুরু হলে গ্যাস পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। কিন্তু সেটি মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে আগে থেকেই বড় ব্যবধান রয়েছে এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে। পেট্রোবাংলাও স্বীকার করেছে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে নতুন অনুসন্ধান ও কূপ খনন করেও বাড়তে থাকা চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হবে না।
তাই সামনে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরীক্ষা হবে মূলত চার জায়গায়—দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কত দ্রুত বাড়ানো যায়, এলএনজি সরবরাহ ও টার্মিনালের বিকল্প ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী করা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি উৎস কতটা বহুমুখী করা যায় এবং ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে নবায়নযোগ্য ও তুলনামূলক কম খরচের উৎসে কত দ্রুত যাওয়া যায়।
সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে দোকানপাট ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুধু চাহিদা কমিয়ে সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো নয়; সেই কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও বহুমুখী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।








