ঢাকা ০৬:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: বিপর্যস্ত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৫:৩৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • / ২৩ বার পড়া হয়েছে

বন্যা-বৃষ্টির অজুহাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি, অভিযোগ ভোক্তাদের

টানা বৃষ্টি ও বন্যার দোহাই দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ানো হচ্ছে। সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম থেকে শুরু করে পেঁয়াজ-মরিচ—প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামই গত এক-দুই সপ্তাহে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বন্যার প্রকৃত প্রভাব বাজারে পড়ার আগেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যদিও বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই।

সবজির বাজারে আগুন

রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দাম এখন কেজিতে ১০০ টাকার উপরে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকায়, করলা ১২০ টাকা, শসা ও গাজর ১২০-১৪০ টাকায়, আর ঝিঙা-চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১১০ টাকায়। তুলনামূলক সস্তা বলে পরিচিত পেঁপে ও পটলও এখন যথাক্রমে ৪০ ও ৬০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ২০০-২২০ টাকায় ঠেকেছে, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। পেঁয়াজের দামও কেজিতে ২০-২৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬৫ টাকায়।

রাজধানীর বাইরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার মতো এলাকাতেও একই চিত্র। স্থানীয় বাজারগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাইরের জেলার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দামে। বিক্রেতারা এর জন্য বর্ষা ও পরিবহন সংকটকে দায়ী করলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, ছয় মাস আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত, এখন সেই অর্থে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যই কেনা যাচ্ছে।

মাছ-মাংস-ডিমেও একই ধারা

মাছের বাজারেও বৃষ্টি-বন্যার অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। চার দিন আগেও যে রুই মাছ বিক্রি হয়েছে ৩৫০-৩৭০ টাকা কেজি দরে, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা ও চাষের চিংড়ির দামও কেজিতে ২০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে এখন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা, যা আগের তুলনায় ২০০ টাকা বেশি।

মুরগির বাজারেও অস্থিরতা কাটেনি। ব্রয়লার মুরগি সপ্তাহখানেক আগে ১৮০-১৯০ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকায়। সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। ডিমের ডজন ১০ দিন আগে ছিল ১২০ টাকা, তা এখন উঠেছে ১৪০ টাকায়। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি দরে, আর খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

ভোক্তাদের ক্ষোভ, নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বিপর্যস্ত

বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, বাজারে পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই, তারপরও বৃষ্টি বা বন্যা হলেই বিক্রেতারা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বাজারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে, কিংবা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কম পরিমাণে কিনতে হচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইনের মতে, বন্যা-বৃষ্টিতে মাঠের ফসলের ক্ষতি হলেও তার বাস্তব প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগে—অথচ প্রভাব পড়ার আগেই অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একশ্রেণির ব্যবসায়ী সারা বছরই একই কায়দায় মূল্য কারসাজি করে ক্রেতাকে ঠকান, অথচ এর বিরুদ্ধে সরকারের তরফে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি।

প্রশাসনের বক্তব্য

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চলছে এবং অসাধু উপায়ে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পেলে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের কাছে দৃশ্যমান স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।

সার্বিক চিত্র

সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি বলছে—বন্যা ও বৃষ্টির প্রকৃত প্রভাবের চেয়ে বাজার তদারকির ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মুনাফালোভী মানসিকতাই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আসন্ন দিনগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: বিপর্যস্ত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত

আপডেট সময় ০৫:৩৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

বন্যা-বৃষ্টির অজুহাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি, অভিযোগ ভোক্তাদের

টানা বৃষ্টি ও বন্যার দোহাই দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ানো হচ্ছে। সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম থেকে শুরু করে পেঁয়াজ-মরিচ—প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামই গত এক-দুই সপ্তাহে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বন্যার প্রকৃত প্রভাব বাজারে পড়ার আগেই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যদিও বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই।

সবজির বাজারে আগুন

রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সবজির দাম এখন কেজিতে ১০০ টাকার উপরে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১৫০ টাকায়, করলা ১২০ টাকা, শসা ও গাজর ১২০-১৪০ টাকায়, আর ঝিঙা-চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১১০ টাকায়। তুলনামূলক সস্তা বলে পরিচিত পেঁপে ও পটলও এখন যথাক্রমে ৪০ ও ৬০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ২০০-২২০ টাকায় ঠেকেছে, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। পেঁয়াজের দামও কেজিতে ২০-২৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬৫ টাকায়।

রাজধানীর বাইরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার মতো এলাকাতেও একই চিত্র। স্থানীয় বাজারগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাইরের জেলার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দামে। বিক্রেতারা এর জন্য বর্ষা ও পরিবহন সংকটকে দায়ী করলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, ছয় মাস আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত, এখন সেই অর্থে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যই কেনা যাচ্ছে।

মাছ-মাংস-ডিমেও একই ধারা

মাছের বাজারেও বৃষ্টি-বন্যার অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। চার দিন আগেও যে রুই মাছ বিক্রি হয়েছে ৩৫০-৩৭০ টাকা কেজি দরে, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা ও চাষের চিংড়ির দামও কেজিতে ২০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে এখন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা, যা আগের তুলনায় ২০০ টাকা বেশি।

মুরগির বাজারেও অস্থিরতা কাটেনি। ব্রয়লার মুরগি সপ্তাহখানেক আগে ১৮০-১৯০ টাকা থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকায়। সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। ডিমের ডজন ১০ দিন আগে ছিল ১২০ টাকা, তা এখন উঠেছে ১৪০ টাকায়। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি দরে, আর খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

ভোক্তাদের ক্ষোভ, নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বিপর্যস্ত

বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, বাজারে পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই, তারপরও বৃষ্টি বা বন্যা হলেই বিক্রেতারা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বাজারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে, কিংবা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কম পরিমাণে কিনতে হচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইনের মতে, বন্যা-বৃষ্টিতে মাঠের ফসলের ক্ষতি হলেও তার বাস্তব প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগে—অথচ প্রভাব পড়ার আগেই অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একশ্রেণির ব্যবসায়ী সারা বছরই একই কায়দায় মূল্য কারসাজি করে ক্রেতাকে ঠকান, অথচ এর বিরুদ্ধে সরকারের তরফে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি।

প্রশাসনের বক্তব্য

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চলছে এবং অসাধু উপায়ে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পেলে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের কাছে দৃশ্যমান স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।

সার্বিক চিত্র

সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি বলছে—বন্যা ও বৃষ্টির প্রকৃত প্রভাবের চেয়ে বাজার তদারকির ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মুনাফালোভী মানসিকতাই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আসন্ন দিনগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।