রাড্ডা থেকে ইসিবি, একের পর এক হামলা-দখলে উদ্বেগ
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ চাই
- আপডেট সময় ০১:৪৫:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৯ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর মিরপুরে একটি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে সম্পত্তি দখলের অভিযোগে হামলা এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর-লুটপাট—মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সংঘটিত এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এসব ঘটনার পেছনে জমি ও সম্পত্তির বিরোধ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অপরাধে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে।
২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে প্রবেশ করে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা, চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য মালামাল লুট এবং পরে এক্সক্যাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনা ভেঙে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করেছেন। ঘটনার পর সেখানে একটি সমবায় সমিতির নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানারও টাঙানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীদের জড়ো করা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সক্যাভেটর আনার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলো গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধমূলক দায় আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
ঘটনাস্থলে পুলিশ, তবু ঠেকানো গেল না
রাড্ডার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে বলা হয়েছে, লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও মালামাল নিয়ে একটি গাড়ি চলে যাওয়ার আগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ পরে বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে।
মোহাম্মদপুরে দিনের আলোয় হামলা
রাড্ডার ঘটনার পরদিন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যে কয়েক শ মানুষ একটি প্লটে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে একটি কার্যালয়ে ভাঙচুর, নগদ অর্থ ও সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ রয়েছে। পরে জায়গাটির চারপাশে ঢেউটিন দিয়ে ঘেরাও করা হয়।
একই সময়ে আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় আরেকটি বহুতল ভবনে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানীতে অন্তত চারটি হামলা, ভাঙচুর ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ সামনে আসে।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা
২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউ গিনি প্রোপার্টিজের একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা হয়। ওই প্রকল্পের মধ্যেই কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও অবস্থিত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্টুডিওসহ আশপাশের স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।
ঘটনার কারণ নিয়ে প্রথমদিকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়। সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজির অভিযোগ তুললেও পুলিশ জানায়, নিউ গিনি প্রোপার্টিজ ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাকে ঘিরে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ প্রাথমিকভাবে ঘটনার পেছনে থাকতে পারে।
এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য জানায়।
উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিবৃতিতে সংগঠনটি রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-দখল, কিশোরগঞ্জে জলমহালকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ মোকাবিলায় দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
৩৮ বিশিষ্ট নাগরিকের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
দেশের ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিকও এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন।
২৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে তারা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও লুটপাট, মোহাম্মদপুরের জমি দখলের অভিযোগ এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলাসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বা পেশিশক্তির প্রভাবে ভূমি ও বাড়ি দখল এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ বেড়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক। তারা জড়িত ব্যক্তি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হোক বিবেচ্য
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সম্পত্তির মালিকানা নিয়েও বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে।
কিন্তু জমি বা সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত ও আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো পক্ষেরই শত শত লোক জড়ো করে হামলা, ভাঙচুর কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।
ডিএমপি কমিশনারও রাড্ডার ঘটনার পর বলেছেন, অপরাধীর দল বা মত বিবেচনা করা হবে না; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে।
এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ চাই
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা জবরদখল শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। এসব ঘটনা সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আইনের শাসনের ওপর আস্থাকে প্রভাবিত করে।
রাজনৈতিক পরিচয় যারই হোক, কোনো ব্যক্তি যেন মনে না করেন যে দলীয় প্রভাব, অর্থ কিংবা পেশিশক্তি ব্যবহার করে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারেন—এটি নিশ্চিত করাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা থেকে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও ইসিবি চত্বর—সাম্প্রতিক প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে যার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
একটি নিরাপদ বাংলাদেশে নাগরিককে নিজের জমি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসা রক্ষার জন্য পেশিশক্তি সংগঠিত করতে হবে না। তিনি রাষ্ট্র ও আইনের ওপর নির্ভর করতে পারবেন।








